‘মা’ মাছ এবং বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির মাছের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও প্রজনন ত্বরান্বিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। গত ০৮ থেকে আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদকরণ, বাজারজাতকরণ, বিনিময় ও ক্রয়-বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। বছরজুরে ‘মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন-১৯৫০’ এর প্রয়োগ না থাকলেও এই সময়ে আইন বাস্তবায়নে সরকারকে কঠোর হতে দেখা গেছে। এই অইনে মৎস্যসম্পদ রক্ষা, জলজ পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রজনন মৌসুমে সুরক্ষা, অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ, জলাশয় ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, জেলেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের কথা বলা হয়েছে। আইন মেনে চলতে নানা রকম সচেতনতামূলক কর্মসূচির পাশাপাশি আইন লঙ্ঘনেও দেওয়া হচ্ছে শাস্তি।
দেশব্যাপী অভিযানে ৫০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে অবৈধ জাল জব্দ
ইতোমধ্যে দেশজুড়ে ২৬টি মোবাইল কোর্ট এবং ১৩৭টি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্যের অবৈধ জাল জব্দ করে জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রা সচল রাখতে বিতরণ করা হচ্ছে ভিজিএফ চাল। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত মাছের চাহিদা মেটাতে ও উৎপাদন বাড়াতে দেশব্যাপী ১৬.৫৭ মেট্রিক টন মৎস্য পোনা অবমুক্ত করেছে সরকার। এছাড়া মৎস্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও টেকসই করতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।
দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান: জাতীয় মাছ ইলিশের নির্বিঘ্ন বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার ঘোষিত ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২৬’ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের মৎস অভিযান সফল করতে ও মৎস আইন বাস্তবায়নে খুলনা বিভাগে ৪৪টি সচেতনতামূলক সভা, বরিশাল বিভাগে ৮৮টি সভা, অর্ধশত মাইকিং ও ১৬ হাজার লিফলেট বিতরণ করা হয়।
সরকারের নানামুখী কর্মসূচির পরেও আইন লঙ্ঘন করে মৎস্য আহরণ ও অবৈধ জাল বিক্রেতা অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলমান রয়েছে। মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায় গত ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী প্রায় ৫ লাখ মিটার (৫০০ কি.মি.) দৈর্ঘ্যের মৎস্য সম্পদ ধ্বংসকারী অবৈধ জাল জব্দ করে পুড়িয়ে দেয় কোষ্টগার্ড ও প্রশাসন।
অভিযানে খুলনা বিভাগে ৭৬টি চায়না দুয়ারী জাল এবং ১ লাখ ৮০ হাজার মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ করে প্রকাশ্যে পোড়ানো হয় এবং অসাধু চক্রের কাছ থেকে ১ লাখ ৫৪ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। বরিশাল জেলায় অভিযান চালিয়ে ৭৫ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ও ১৭টি চায়না দুয়ারী জাল উদ্ধার করে বিনষ্ট করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জের সদর, করিমগঞ্জ, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলায় পরিচালিত অভিযানে ৩৪টি চায়না দুয়ারী ও ১ হাজার ২০ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়।
গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বেলাই বিল, মোহানী ও ফুলদী অংশে অভিযান চালিয়ে ২৮টি চায়না ম্যাজিক জাল ও ৯টি কারেন্ট জাল উচ্ছেদ করা হয়েছে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১০০টি রিং জাল ও ২০টি মশারি জাল বিনষ্টের পাশাপাশি জলমহালে অবৈধভাবে স্থাপিত নেটের বাঁধ অপসারণ করা হয়। সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ১টি কোনা জাল ও ৫টি চায়না দুয়ারী জাল জনসম্মুখে আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়।
রংপুর জেলায় ৭১টি চায়না দুয়ারী জাল এবং নিষিদ্ধ ১৬ কেজি পিরানহা মাছ জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। নীলফামারী সদর উপজেলায় ৬১টি চায়না দুয়ারী জাল ধ্বংসের পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলায় ২৩টি চায়না দুয়ারী জাল ধ্বংস এবং পশুখাদ্য আইন লঙ্ঘনের দায়ে একটি গোডাউন থেকে ২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
জেলেদের সহায়তা: মৎস্য সংগ্রহের নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রা সচল রাখতে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশব্যাপী ভিজিএফ চাল বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা বিভাগের ৮টি জেলায় ২৩,৫০৭টি জেলে পরিবারকে ৫৮৭.৬৯ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় ২৪,৪১২টি পরিবারকে ৬১০.২৯৫ মেট্রিক টন, চট্টগ্রাম বিভাগের ৭টি জেলায় ৪৭,০১২ পরিবারকে ১,১৭৫.৩০ মেট্রিক টন, খুলনা বিভাগের ৪টি জেলায় ৬,৯৮৯ পরিবারকে ১৭৪.৭২৫ মেট্রিক টন, রাজশাহী বিভাগের ৬ জেলায় ৭,২৮৯ পরিবারকে ১৮১.৯৭৫ মেট্রিক টন, ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলায় ৪,০২০ পরিবারকে ১০০.৫০ মেট্রিক টন এবং রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের ৭,১১৮টি জেলে পরিবারকে ১৭৭.৯৪ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করেছে সরকার।
টেকসই উৎপাদনে নানামুখী কর্মসূচি: ‘মৎস্যখাতে সরকারের উন্নয়ন ভাবনা’ নিয়ে একাধিক কর্মশালা করছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ভোরের ডাককে জানিয়েছেন, মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে দেশব্যাপী উন্মুক্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক জলাশয়ে গত ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১৬.৫৭ মেট্রিক টন রুই জাতীয় মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। গত ০৭ অক্টোবর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ৩টি পুকুরে ৪০০ কেজি রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। একই দিনে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ৫৮টি জলাশয়ে ৪৯০ কেজি পোনা অবমুক্ত করা হয়। এই কর্মসূচি দেশব্যাপী চলমান রয়েছে বলে জানান মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
ওদিকে টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হয়েছে। পাইকগাছায় সুন্দরবন উপকূল হতে ইকথায়োপ্লাঙ্কটনের নমুনা সংগ্রহ ও শনাক্তকরণ কার্যক্রম চলছে। ময়মনসিংহে কৃত্রিম প্রজনন গবেষণার জন্য প্রাকৃতিক উৎস থেকে ৬৫টি কুচিয়া মাছ সংগ্রহ করা হয়। চাঁদপুরের প্রধান মাছঘাটগুলোতে ইলিশের শারীরিক বৃদ্ধি ও প্রজনন ক্ষমতার উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। কক্সবাজারের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রে সফলভাবে ২২ দিন বয়সী কোরাল/ভেটকি মাছের পোনা উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া কাপ্তাই হ্রদের অভয়াশ্রমে মৎস্য জীববৈচিত্র্য ও উৎপাদনের প্রভাব বিশ্লেষণে তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।