নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, দ্রুত রোগ নির্ণয়, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজন, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা ও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড চালুর ফলে রোগীদের ভোগান্তি কমছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
উপজেলার সাধারণ মানুষের সরকারি চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত বহির্বিভাগের পাশাপাশি জরুরি বিভাগে দিন-রাত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রাথমিক ও সাধারণ চিকিৎসার জন্য রোগীদের জেলা সদর কিংবা রাজধানীমুখী হওয়ার প্রয়োজন আগের তুলনায় কমছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রোগ নির্ণয় আরও দ্রুত ও সহজ করতে সম্প্রতি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর অর্থায়নে একটি আধুনিক সেল কাউন্টার মেশিন সংযোজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের রক্ত পরীক্ষা দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে। এতে রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি রোগীদের সময় ও ভোগান্তি কমছে।
ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ শয্যার পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকায় এ পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। পাশাপাশি চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে এক্স-রে ও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা সরকারি নির্ধারিত মূল্যে করা হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারি সরবরাহ করা ওষুধ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় রোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও তদারকির ফলে হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরের পরিবেশেও পরিবর্তন এসেছে। রোগীদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা নিয়মিত কাজ করছেন।
হাসপাতালকেন্দ্রিক সেবার পাশাপাশি উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতেও বিভিন্ন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন, ওপেন এসআরপি কর্মসূচির মাধ্যমে ডিজিটাল স্বাস্থ্যতথ্য সংরক্ষণ, ভারবাল অটোপসি এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম তদারকিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রায়পুরার নিলক্ষা এলাকার বাসিন্দা শওকত আলী বলেন, আগে হাসপাতালে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। পরিবেশও তেমন ভালো ছিল না। এখন চিকিৎসকেরা মনোযোগ দিয়ে রোগীদের কথা শুনছেন এবং হাসপাতালের পরিবেশও আগের তুলনায় পরিচ্ছন্ন হয়েছে।
জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন শফিকুল ইসলাম বলেন, জরুরি প্রয়োজনে এখন আগের তুলনায় দ্রুত চিকিৎসক ও নার্সদের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। চিকিৎসকদের আন্তরিকতায় রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তিও কমেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জান্নাতুন নাঈম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের মানুষের কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং সরকারি ওষুধের স্বচ্ছ বণ্টন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইপিআই, হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন, কমিউনিটি ক্লিনিক, ওপেন এসআরপি ও ভারবাল অটোপসির মতো কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে।
ডা. জান্নাতুন নাঈম আরও বলেন, সেল কাউন্টার মেশিনের মতো আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজনের ফলে রোগ নির্ণয়ের গতি ও সক্ষমতা বেড়েছে। চিকিৎসক, নার্স, মাঠকর্মী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সেবার মান উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল ও আরও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম পাওয়া গেলে রায়পুরার মানুষকে উন্নত ও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
নরসিংদীর সিভিল সার্জন ডা. মো. বুলবুল কবীর বলেন, চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সহজ করতে আরও একটি ১৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি ‘জীবন তরী’ পাঠানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ে সেবার মানোন্নয়নে নেওয়া উদ্যোগগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। পাশাপাশি শয্যাসংখ্যা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা গেলে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে আরও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হবে।