“আমি এখনো একজন শিশু, এত কম বয়সে বিয়ে হওয়া কোনোভাবেই ভালো কিছু হতে পারে না”— এভাবেই নিজের বুকচাপা কষ্ট প্রকাশ করছিল আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বাদগিস প্রদেশের রাজধানী কলা-ই-নাও অঞ্চলের ১১ বছর বয়সী বালিকা খাতিরাহ্। ঋণের দেনা মেটাতে মাত্র এগারো বছর বয়সেই তাকে ২০ বছর বয়সী এক যুবকের কাছে বিয়ে হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
খাতিরাহ্-র ৪০ বছর বয়সী মা নূর বিবি জানান, বাগদানের পর থেকেই মেয়েটি সব সময় আতঙ্কে থাকে এবং অঝোরে কাঁদে। হবু স্বামী বাড়িতে এলে সে পালিয়ে যায় এবং সমবয়সীদের সামনে বিবাহিতা হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জায় ঘরের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
বাদগিস প্রদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ বৃষ্টিনির্ভর কৃষি ও গবাদিপশু পালনের ওপর নির্ভরশীল। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে টানা ভয়াবহ খরা মানুষের উপার্জনের সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে অনাহার থেকে বাঁচতে ও পরিবারের অন্য সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিতে কন্যাসন্তানদের অল্প বয়সে বিক্রি করে দেওয়া এখন সেখানকার পরিবারগুলোর কাছে টিকে থাকার শেষ উপায়ে পরিণত হয়েছে। বার্তা সংস্থা দ্য গার্ডিয়ানের এক হৃদয়বিদারক প্রতিবেদনে এই করুণ চিত্র উঠে এসেছে।
তাইজ নাওয়াহ্ গ্রামের অধিবাসী গুল বোবো অনাহার থেকে বাঁচতে তাঁর দুই ও পাঁচ বছর বয়সী দুই কন্যাসন্তান রুবিনা ও নাজিলাকে বিয়ের নামে বিক্রি করে দিয়েছেন। গুল বোবো কেঁদে বলেন, “আমি জানি ওরা খুব ছোট এবং শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের শিকার হবে। কিন্তু আমাদের আর কিছুই করার ছিল না।”
১১ বছর বয়সী গুল আলাইকে তার বাবার দেনা শোধ করতে প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক দোকানদারের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বাগদান করানো হয়েছে। মেয়েটির বাবা নিয়াজ মোহাম্মদ আক্ষেপ করে বলেন, “পরিবারের অন্য সদস্যদের বাঁচাতে আমাদের একজনকে বিসর্জন দিতে হচ্ছে।” এই পরিবারটি এখন আবর্জনা পুড়িয়ে জঙ্গল থেকে আনা বুনো শাক সিদ্ধ করে খেয়ে দিন কাটাচ্ছে।
১০ বছর বয়সী নাজিয়াকে ২,৩০০ পাউন্ডে বিক্রি করা হয়েছে পরিবারের ঋণ মেটাতে। অন্যদিকে, সুরগুল নামের এক ব্যক্তি পরপর তিন দিন পুরো পরিবার উপোস থাকার পর বাধ্য হয়ে তাঁর ১০ বছর বয়সী মেয়ে জার্তিলা এবং ৭ বছর বয়সী মেয়ে বিবি আয়েশাকে বিক্রি করে দেন।
বাস্তুচ্যুতি, শিশুশ্রম ও চরম বিপর্যয়
বিগত নয় বছর ধরে চরম খরার কারণে হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে শহরের দিকে ছুটছেন। কলা-ই-নাও শহরের রাস্তায় আইসক্রিম বিক্রেতা ৫৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইয়ায়াজ সকালে তাঁর ৬ বছরের মেয়ে জুবাইদাকে নিয়ে প্লাস্টিকের বোতল কুড়ান। অভাবের তাড়নায় তিনি ১৫ বছরের বড় মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর এখন ৬ বছরের জুবাইদাকে এক ১২ বছরের বালকের সাথে বাগদান করিয়েছেন।
বাস্তুচ্যুত অনেক পরিবার হেরাত শহরের ‘শাহরাক-ই-সবজ’ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিলেও বৈশ্বিক সাহায্য কমে যাওয়ায় সেখানেও চরম হাহাকার চলছে।
অঙ্গ বিক্রি ও ক্যানসার আক্রান্ত সন্তানের চিকিৎসা
শাহরাক-ই-সবজ শিবিরের বাসিন্দা বাহাউদ্দিন অনাহার থেকে পরিবারকে বাঁচাতে তাঁর ১০ বছর বয়সী ছেলে জিয়াউদ্দিনের একটি কিডনি ১ লাখ আফগানিতে বিক্রি করে দিয়েছেন। নিজে অসুস্থ থাকায় সন্তানের শরীর থেকেই অঙ্গ বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি।
৩০ বছর বয়সী খোমাখা তার মাত্র তিন মাস বয়সী মেয়ে ফাতেমাকে বিয়ে দেওয়ার চুক্তি করেন। কারণ তাঁর আট বছরের ছেলে এহসানউল্লাহ রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত এবং তাকে হাসপাতালে নেওয়ার যাতায়াত ভাড়াটুকুও তাঁদের কাছে ছিল না।
জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্বেগ
খুশকিয়ান গ্রামের আব্দুল আজিজ গত আট বছরে সাতবার গমের ফসল হারিয়ে ঋণের দায়ে একে একে তার পাঁচ মেয়েকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর ১৩ বছর বয়সী মেয়ে শামায়েল বলে, “জলবায়ু ও দারিদ্র্যের এই যুদ্ধ আমাদের আগের সামরিক যুদ্ধের চেয়েও বেশি নিঃস্ব করে দিয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য কেউ জমি বিক্রি করছে, আবার কেউ নিজের মেয়েকে বিক্রি করে দিচ্ছে।”
ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনালের আফগানিস্তান বিষয়ক অ্যাডভোকেসি ডিরেক্টর মার্ক কাল্ডার জানান, বাল্যবিয়ে অল্পবয়সী মেয়েদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সাহায্য হ্রাস পাওয়ায় যে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো চিকিৎসা দিত, সেগুলোও এখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এমন চরম বাস্তবতার মধ্যেও সারা নামের এক মা বকেয়া ভাড়ার জন্য বাড়িওয়ালার তাড়া খাওয়া সত্ত্বেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, যেন ১২ বছর বয়সী মেয়ে আয়েশাকে এখনই শ্বশুরবাড়ির লোকজন নিয়ে যেতে না পারে। তিনি চান মেয়েটি যেন অন্তত কিছুদিন শান্তিতে ঘরে বসে স্কুলের পড়াটা চালিয়ে যেতে পারে।