
গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামানের নেতৃত্বে টাস্কফোর্সের সদস্যরা তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর মজুতের সাতটি স্থানে তল্লাশি চালান। এ সময় বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা প্রায় ২৫ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়। জব্দ করা পাথর ভাঙার মেশিনগুলো সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশের জিম্মায় রাখা হয়েছে।
অভিযানসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিস্তা নদী থেকে পাথর উত্তোলনের পর নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে সেগুলো মজুত ও প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছিল। এসব মজুতকেন্দ্র ঘিরে পরিচালিত অবৈধ কার্যক্রম বন্ধের লক্ষ্যেই অভিযান চালানো হয়। এ সময় পাথরবোঝাই একটি ট্রাকও আটক করা হয়। ট্রাকটিতে প্রায় ৪০০ ঘনফুট পাথর ছিল।
অভিযানে টেপাখড়িবাড়ী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়নের ভূমি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও অভিযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের একটি দল এবং পুলিশ অংশ নেয়। অভিযানে বিজিবির ২২ সদস্য সহায়তা করেন।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন বাদী হয়ে ডিমলা থানায় মামলা করেছেন বলে জানা গেছে। ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুল ইসলাম মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন নিয়ে একাধিক সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ গত ১০ অক্টোবর ‘ডিমলায় তিস্তায় পাথর লুটের কাণ্ড, প্রশাসনের দায়সারা অভিযানে চরম বেপরোয়া সিন্ডিকেট’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নদীজুড়ে অবৈধ পাথর উত্তোলন এবং আগের অভিযানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এর পরই মজুতকেন্দ্রগুলোতে প্রশাসনের এ অভিযানকে অবৈধ পাথর বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
তবে এ অভিযানের স্থায়ী সাফল্য নির্ভর করবে অবৈধ পাথর উত্তোলন, মজুত, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনের সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রকে কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার ওপর।
তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলন এবং নদীতীরে যন্ত্রপাতি বসিয়ে পাথর প্রক্রিয়াজাত করার ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তীরের স্থিতিশীলতা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে নদী ও তীরবর্তী জনপদের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু পাথর উত্তোলনের স্থানে অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অবৈধ পাথরের মজুতকেন্দ্র, ভাঙার মেশিন ও পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি জব্দ করা পাথর ও যন্ত্রপাতির বিষয়ে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন, মজুত ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও জানান, জব্দ করা পাথর আইনগত প্রক্রিয়া শেষে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে।
তিস্তার পাথর লুট বন্ধে এবারের অভিযান কতটা স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়। বিপুল পরিমাণ পাথর জব্দ ও মামলা দায়েরের পাশাপাশি অবৈধ উত্তোলনের উৎস বন্ধ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা গেলে নদী রক্ষায় এ অভিযান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।