তিস্তার বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে শুরু হয়েছে আগাম জাতের ভুট্টা চাষের প্রস্তুতি। কিন্তু বীজ বপনের আগেই কৃষকের মনে দুশ্চিন্তা—কোনটি আসল, কোনটি নকল ভুট্টাবীজ, তা বুঝবেন কীভাবে? বিভিন্ন কোম্পানির নাম ও মোড়কে বীজ বিক্রির অভিযোগ, পাটগ্রামে অবৈধভাবে বীজ প্যাকেটজাত করার অভিযোগে একটি গোডাউন সিলগালা এবং গত বছরের বীজ না গজানোর অভিযোগসংবলিত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় এ আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে রবি মৌসুমে ধানের চাষ হয় না বললেই চলে। তুলনামূলক কম খরচে ভালো ফলনের আশায় এসব এলাকার কৃষকেরা ভুট্টা চাষের ওপর নির্ভরশীল। অক্টোবর মাস থেকে আগাম জাতের ভুট্টাবীজ বপন শুরু হয়। ফলে এই সময়ে বীজের মান নিয়ে অনিশ্চয়তা কৃষকদের বাড়তি দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।
স্থানীয় একাধিক কৃষকের অভিযোগ, কিছু অসাধু বীজ ব্যবসায়ী বিভিন্ন কোম্পানির নাম ব্যবহার করে প্যাকেটজাত বীজ বাজারে বিক্রি করছেন। এতে আসল বীজের বদলে নকল বা নিম্নমানের বীজ কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তাঁরা।
কৃষকদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ গত ১০ অক্টোবর পাশের পাটগ্রাম উপজেলার বানিয়াপাড়া এলাকায় একটি গোডাউন সিলগালা করার ঘটনা। বীজ আইন ও বীজ বিধিমালা না মেনে অবৈধভাবে ভুট্টাবীজ প্যাকেটজাত করার অভিযোগে গোডাউনটি সিলগালা করেন পাটগ্রামের উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিশাল দাস।
শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাতীবান্ধার আল আমীন নামে এক ব্যক্তির নির্দেশে সেখানে ‘বাহুবলী ৫৫৫’ (বিজেতা সীডস) জাতের মোড়ক ব্যবহার করে বীজ প্যাকেটজাত করা হচ্ছিল।
এ বিষয়ে আল আমীন বলেন, ভারত থেকে বীজ আমদানি করা হয়েছে এবং কোম্পানির সরবরাহ করা ‘বাহুবলী-৫৫৫’ ব্র্যান্ডের মোড়কেই সেগুলো প্যাকেটজাত করা হচ্ছিল। তবে বীজের উৎস, মান ও প্যাকেটজাতকরণের বৈধতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কৃষকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে গত বছরের একটি ভিডিও, যা সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে এক কৃষককে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, তিনি ‘বাহুবলী ৫৫’ জাতের ২৪ প্যাকেট ভুট্টাবীজ বপন করেও গাছ পাননি। এতে তাঁর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ভিডিওতে এক খুচরা বীজ বিক্রেতাকে বলতে শোনা যায়, আল আমীনের কাছ থেকে তিনি ৫০০ কেজি ‘বাহুবলী ৫৫’ জাতের ভুট্টাবীজ কিনে বিক্রি করেছিলেন। বীজ গজায়নি—এমন অভিযোগ ওঠার পর কৃষকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বীজ দিতে হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ভিডিওতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা, সংশ্লিষ্ট বীজের মান এবং ক্ষতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হাতীবান্ধার গড্ডিমারী চর এলাকার কৃষক আরমান বলেন, পাটগ্রামে ভুট্টাবীজ প্যাকেটজাত করার ঘটনায় গোডাউন সিলগালা হওয়ার পর থেকে বীজ নিয়ে তাঁর সন্দেহ বেড়েছে।
একই এলাকার কৃষক সোনা মিয়া বলেন, গত বছরের ভিডিওটি ফেসবুকে দেখার পর খুচরা বীজ বিক্রেতাদের ওপর তাঁর আগের মতো আস্থা থাকছে না।
ধুবনী গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদের অভিযোগ, অসাধু বীজ ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ কৃষকেরা। তাঁর দাবি, এলাকায় কৃষি কর্মকর্তাদের তেমন দেখা যায় না; ফলে বীজ নির্বাচন ও চাষাবাদ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শও পাওয়া কঠিন হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের পরামর্শ চান কৃষকেরা
চরাঞ্চলের কৃষকদের আশঙ্কা, বীজ বপনের পর যদি তা না গজায় বা প্রত্যাশিত ফলন না হয়, তাহলে তাঁদের পুরো মৌসুমের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে। ভুট্টা তাঁদের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল হওয়ায় এমন ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বীজের মান যাচাই, অনুমোদিত বিক্রেতার কাছ থেকে বীজ কেনা নিশ্চিত করা, সন্দেহজনক বীজের প্যাকেট পরীক্ষা এবং কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাতীবান্ধা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুন মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুট্টা বপনের মৌসুমে কৃষকদের এই উদ্বেগ কাটাতে বীজের মান ও বাজারজাতকরণ তদারকি জোরদার করা জরুরি। কারণ, বীজের শুরুতেই ভুল হলে তার মাশুল দিতে হতে পারে কৃষককে পুরো ফসলের ক্ষতির মধ্য দিয়ে।