সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলছে, নদীতে অভিযানও অব্যাহত—তবু থামানো যাচ্ছে না মা ইলিশ শিকার। মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা নদীতে অবাধে ধরা হচ্ছে ডিমওয়ালা ইলিশ। শুধু মাছ ধরেই ক্ষান্ত নন জেলেরা; নদীপাড়ে বসেছে অস্থায়ী ‘ইলিশের হাট’। সেখানে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ সময়ে ধরা ইলিশ। প্রজনন মৌসুমে এমন চিত্র ইলিশের বংশবিস্তার ও ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে শিবচর উপজেলার বন্দরখোলা, মাদবরেরচর, চরজানাজাত ও কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নসংলগ্ন পদ্মার তীরে দেখা যায় এমন পরিস্থিতি। জেলেদের ট্রলার থেকে মাছ নামানোর পর ফড়িয়ারা সেগুলো কিনে নদীপাড়ের অস্থায়ী বাজারে বিক্রি করছেন। ক্রেতারাও ভিড় করছেন সেই হাটে। ফলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নদীর পাড়ে চলছে ইলিশের বেচাকেনা।
নদীপাড়ের অস্থায়ী হাটে আকারভেদে ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোট ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ক্রেতাদের উপস্থিতি ও প্রকাশ্য বেচাকেনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
ইলিশ কিনতে আসা সজিব খালাসি জানান, তিনি একজন প্রবাসী। দেশে এসে নদীপাড়ের বাজারে ছোট-বড় নানা আকারের ইলিশ দেখতে পেয়েছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, সেখানে পুরুষ ক্রেতার তুলনায় নারী ক্রেতার উপস্থিতি বেশি ছিল। প্রশাসনের অভিযান চলার কথা থাকলেও অস্থায়ী বাজার বসায় বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে জানান, জাল কেনার জন্য ঋণ করতে হয়েছে তাঁদের। পাশাপাশি সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটানোর চাপ রয়েছে। এসব কারণে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মাছ ধরতে বাধ্য হচ্ছেন বলে দাবি তাঁদের।
তবে জীবিকার সংকট থাকলেও প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ শিকার দীর্ঘমেয়াদে জেলে সম্প্রদায়ের জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ সময় ডিম ছাড়ার সুযোগ না পেলে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে ভবিষ্যতে নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতা ও জেলেদের আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে সরকার ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও কেনাবেচায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এ সময় আইন অমান্য করে ইলিশ ধরা ও বেচাকেনা বন্ধ রাখার কথা। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, পদ্মার দুর্গম চরাঞ্চল এবং নজরদারির সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে কিছু এলাকায় মাছ ধরা ও বিক্রি চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শুধু নদীতে অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; অবৈধভাবে ধরা মাছ কেনাবেচার স্থানগুলোও বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সময় অসচ্ছল জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে তাঁরা জীবিকার তাগিদে আইন ভাঙতে বাধ্য না হন।
শিবচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, জনবল সংকটের কারণে পুরো এলাকায় শতভাগ নজরদারি নিশ্চিত করা কঠিন। তবে কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালানো হচ্ছে।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান চলছে। নদীপাড়ের অবৈধ অস্থায়ী হাট বন্ধে শিগগিরই বড় ধরনের সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।
মা ইলিশ রক্ষার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পদ্মার পাড়ে এমন হাট বসার ঘটনায় কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের প্রশ্ন সামনে এসেছে। ইলিশের প্রজনন রক্ষা করতে হলে নদীতে মাছ ধরা বন্ধের পাশাপাশি অবৈধ বেচাকেনার পথও বন্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে জেলেদের বিকল্প সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হতে পারে।