ইউরোপের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কাজ করছে খুলনা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি)। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) পরিচালনায় বাস্তবায়নাধীন ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণার্থীদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ইতালীয় ভাষা, নিরাপদ অভিবাসন ও শ্রম অধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ কর্মী তৈরি এবং ইউরোপে নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
খুলনা নগরীর তেলিগাতী-কুয়েট রোড এলাকায় অবস্থিত খুলনা টিটিসি জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে পরিচালিত একটি সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। এখানে বিভিন্ন মেয়াদে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ইউরোপের শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ কর্মী তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্পের অন্যতম বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।
প্রকল্পের আওতায় খুলনা টিটিসিতে ওয়েল্ডিং, ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স (ইআইএম), প্লাম্বিং ও মোটর ড্রাইভিং—এই চারটি পেশায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এসব পেশায় মোট ৪৪০ জন কর্মীকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) লেভেল-৩ সনদ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, একই প্রকল্পের আওতায় ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে বিভিন্ন পেশায় মোট তিন হাজার প্রশিক্ষণার্থীকে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন তিন মিলিয়ন ইউরো অর্থায়ন করছে। এর প্রধান লক্ষ্য হলো অভিবাসন ব্যয় কমানো, দেশের দক্ষতার ঘাটতি পূরণ এবং বাংলাদেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোতে নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ তৈরি করা।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মীদের প্রস্তুত করতে শুধু কারিগরি প্রশিক্ষণেই সীমাবদ্ধ থাকছে না খুলনা টিটিসি। প্রশিক্ষণার্থীদের ইতালীয় ভাষা শেখানোর পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছে ১০ দিনব্যাপী প্রি-ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশন (পিডিও)।
এই ওরিয়েন্টেশনে পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য, নৈতিক অভিবাসন, ইউরোপীয় সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। ফলে বিদেশে কর্মস্থলে যোগদানের আগে প্রয়োজনীয় ভাষাগত ও সামাজিক প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন প্রশিক্ষণার্থীরা।
খুলনা টিটিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের প্রথম দুই ধাপে মোট ২০৭ জন প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৯১ জন দক্ষতা মূল্যায়ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এ ক্ষেত্রে সাফল্যের হার ৯৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
বর্তমানে তৃতীয় ধাপেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। এ ধাপে ওয়েল্ডিং লেভেল-৩ যুক্ত হওয়ায় মোট চারটি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
প্রশিক্ষণার্থীদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা দিতে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে খুলনা টিটিসি। এর আওতায় মেসার্স খোকন মোটরস এবং কোয়ালিটি ডাইভারসিফাইড জুট মিলস লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানে কর্মক্ষেত্রভিত্তিক হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের (ওজেটি) সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, কারিগরি দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, আন্তর্জাতিক মানের সনদ এবং বাস্তব কর্ম-অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে প্রশিক্ষণার্থীরা দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন। একই সঙ্গে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং ইউরোপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের উপযুক্তভাবে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।