ইয়েমেনের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের দীর্ঘ বঞ্চনা ও নির্মম অবরোধের স্মৃতি পেছনে ফেলে স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তাইজ শহরের বাসিন্দারা। কিন্তু সেই স্বস্তি টেকেনি। হুতি বিদ্রোহীদের নতুন করে চালানো আগ্রাসন ও কৌশলগত অঞ্চল দখলের মুখে তাইজ শহর ফের এক নিদারুণ অবরুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’ (এপি)-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অবরুদ্ধ এই শহরের মানুষের জীবন সংগ্রামের এক রূঢ় ও হৃদয়বিদারক বাস্তবচিত্র।
তাইজে নতুন করে হুতি বিদ্রোহীদের ঘেরাওয়ের খবর পেয়ে দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন উইআম আব্দুল্লাহ। ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের শুরুর দিকে বছরের পর বছর তাঁরা এই শহরে বিদ্রোহীদের নির্মম অবরোধ সহ্য করেছেন; সেই একই অমানবিক অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি আর দেখতে চাননি তাঁরা।
উইআমের পরিবার শহর ছেড়ে বের হওয়ার ঠিক পরপরই গত ৪ অক্টোবর হুতি বিদ্রোহীরা তাইজ শহরের প্রবেশপথের অত্যন্ত কৌশলগত একটি অংশ দখল করে নেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো থেকে তাইজে সব ধরনের রসদ ও সরবরাহ আসার পথ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দক্ষিণের একটি নিরাপদ প্রদেশে বসে ফোনে উইআম আব্দুল্লাহ এপিকে বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই নিজেদের মৃত বলে মনে করছি। শহরের মানুষের মধ্যে এক গভীর হতাশা বিরাজ করছে। আমাদের মনে হচ্ছে আমরা যেন অভিশাপ নিয়ে বেঁচে আছি।”
ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যুদ্ধপরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করিয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ ১২ বছরের গৃহযুদ্ধে বড় কোনো বিজয়ের লক্ষ্যে তারা এবার ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম ঐতিহাসিক শহর তাইজ দখলের সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। এর আগে গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলীয় এলাকাগুলো তড়িৎ অভিযানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় বিদ্রোহীরা। লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ হাতে আসায় সৌদি আরবের জ্বালানিবাহী জাহাজে হামলা চালানো তাদের জন্য সহজ হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
পাহাড় ও দুর্গম পর্বতমালায় ঘেরা দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনের তাইজ শহরের ১০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা এখন তীব্র আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। শহরের প্রাণকেন্দ্রের দোকানগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যতের আশঙ্কায় খাদ্য ও জরুরি পণ্য মজুদের হুড়োহুড়ির সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যদ্রব্য ও পানির দাম আকাশচুম্বী করে দিয়েছে।
স্থানীয় একটি অলাভজনক সংস্থার শিশু সুরক্ষা বিষয়ক পরামর্শক শাইফ আল-গাবিরে জানান, অনেকে বাধ্য হয়ে রান্নার কাজের জন্য কাঠ ও কার্টুন কুড়িয়ে জমা করছেন। জ্বালানি সংকট এতটাই প্রকট যে, তাইজ প্রাদেশিক স্বাস্থ্য কার্যালয়ের ডা. ফাহাদ নাজারি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেকোনো মুহূর্তে হাসপাতালের জেনারেটর চালানোর ডিজেল শেষ হয়ে যেতে পারে এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ বন্ধ হয়ে বিশাল মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
শহরের চারপাশে পাহাড়ে অবস্থান নেওয়া সরকারি বাহিনী এবং হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে তীব্র গোলাগুলির বিকট শব্দ শহরের ভেতর থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কিছু রকেট ও আর্টিলারি শেল ইতোমধ্যে শহরের ভেতরে এসে পড়ায় বাসিন্দাদের সেই পুরোনো দিনের নরকযন্ত্রণার স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাইজের তুরবাহ এলাকা পেরিয়ে সরকার নিয়ন্ত্রিত লাহজ প্রদেশে পৌঁছানোর সৌভাগ্য উইআম আব্দুল্লাহর পরিবারের হলেও, তাদের পার হওয়ার ঠিক পরেই হুতিরা তুরবাহও দখল করে নেয়। ফলে তাইজ ও আশপাশের এলাকা পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
তাইজ শহরের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় পরিচালক আবদেলরহমান আল-কালিয়া জানান, এই আকস্মিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে। পাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দা আহমেদ আবদেল-জাবেরের বাড়িতে শেল পড়ে তার ৭ বছর বয়সী নাতনি গুরুতর আহত হওয়ার পর তিনি পুরো পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত তাইজের ক্যাফেতে বসে শাইফ আল-গাবিরে আক্ষেপ করে বলেন, “আমি জানি যেকোনো মুহূর্তে একটি সামরিক শেল বা বিস্ফোরক এসে আমার ওপর পড়তে পারে, গুঁড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো ঘরবাড়ি কিংবা রাস্তাঘাট।” দীর্ঘ যুদ্ধবিরতির পর ফের নরককুণ্ডে পরিণত হওয়া তাইজের এই অবরুদ্ধ জনপদের মানুষ এখন চরম অনিশ্চয়তা ও ত্রাসের রাজত্বে দিন কাটাচ্ছে।