বিশ্ব অর্থনীতি শিগগিরই তার সংকট সামলানোর সক্ষমতার শেষ সীমানায় পৌঁছে যেতে পারে বলে এক মারাত্মক সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত, বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, জরুরি তেলের মজুত আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়া এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে নতুন কোনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
আইএমএফের প্রতিবেদন ও সতর্কবার্তার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
কমছে জরুরি তেলের মজুত, বাড়ছে জ্বালানি ঝুঁকি
আইএমএফ জানিয়েছে, গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বিকল্প রুটে তেল সরবরাহ ও কৌশলগত মজুত উন্মুক্ত করার ফলে বাজার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলেও বিশ্ব অর্থনীতি এখনও ঝুঁকিমুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসার খবর পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কোনো ভূরাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত তৈরি হলে বিশ্ববাজারে হু হু করে তেলের দাম বাড়তে পারে, যা সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে এবং মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করবে।
প্রবৃদ্ধির সামান্য অগ্রগতি হলেও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি
ঝুঁকির নানা দিক সত্ত্বেও চলতি ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়ে ৩.১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে আইএমএফ (জুলাইয়ে যা ছিল ৩ শতাংশ)। তবে ২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য চলতি ও আগামী বছরে ২.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এ বছর কিছুটা বাড়লেও আগামী ২০২৭ সালে তা কমে ১.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক গড় মূল্যস্ফীতি ৪.৭ শতাংশে অবস্থান করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও এআই বাজারের ধস সংক্রান্ত বড় ঝুঁকি
প্রতিবেদনে আইএমএফ জোর দিয়ে বলেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া কিংবা নতুন করে ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক হামলার আশঙ্কা জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম একলাফে বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি, সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাজারে গড়ে ওঠা বিশালাকার বিনিয়োগের বুদ্বুদ বা ‘এআই বাবল’ হঠাৎ ফেটে গিয়ে বিশ্ব আর্থিক বাজারে ধস নামার ঝুঁকিকেও অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
আইএমএফের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সিলভানা তেনরেইরো এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা যৌথভাবে বিশ্বনেতাদের পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, নীতিনির্ধারকদের কেবল স্বল্পমেয়াদী সংকট মোকাবিলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অহেতুক ব্যয় সামলে আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা বা ‘বাফার’ পুনর্গঠনে অবিলম্বে গুরুত্ব দিতে হবে।