ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি আর তরুণদের রাজপথের আন্দোলন—সব মিলিয়ে উত্তপ্ত ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। যন্তর-মন্তরে প্রস্তাবিত বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের অনুমতি প্রত্যাখ্যান, ব্যাপক নিরাপত্তা মোতায়েন, মেট্রো ও রেল চলাচলে বিধিনিষেধ এবং ধরপাকড়ের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, একটি বিক্ষোভ মোকাবিলায় দিল্লিজুড়ে এত কঠোর ব্যবস্থা কেন?
শনিবার (১০ অক্টোবর) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। ভোটার তালিকা সংশোধনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সংগঠনটি এই কর্মসূচির আয়োজন করে। তবে নির্ধারিত কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল এবং আগের কর্মসূচিতে শর্ত ভঙ্গের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তার বলয়ে রাজধানী
বিক্ষোভ ঘিরে শুক্রবার থেকেই দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর ৩০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। যন্তর-মন্তরের দিকে যাওয়ার বিভিন্ন সড়কে একাধিক স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়। বিক্ষোভের আশঙ্কায় মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং ট্রেন চলাচল সীমিত করার সিদ্ধান্তও নেয় কর্তৃপক্ষ।
নর্দার্ন রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর দিল্লিতে আসা ও দিল্লি থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল—এমন অন্তত ২৪৫টি ট্রেন বাতিল করা হয়। সম্ভাব্য যানজট ও যাত্রীদের দুর্ভোগ এড়ানোর কথা জানিয়ে এ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেয় রেল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধ ও মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।
ধরপাকড়, আটক নেতারাও
আন্দোলন ঘিরে ধরপাকড়ের ঘটনাও সামনে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভকারী ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকও আটক হন। দিল্লির বাইরে থেকে আন্দোলনের সমর্থক ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ বাসস্ট্যান্ডের কাছ থেকে আটকের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং আটকের পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কেন এই আন্দোলন?
এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করেই আন্দোলনটি জোরালো হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়। তবে নাম বাদ পড়ার সংখ্যা, তার কারণ এবং এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণদের আন্দোলন কি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে?
সিজেপির নেতৃত্বে তরুণদের সংগঠিত করার উদ্যোগ এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। আন্দোলনকারীরা একে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরছেন। অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, কর্মসূচির অনুমতি না দেওয়া এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের পেছনে আইনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো কাজ করেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিজেপি সরকার রাজনৈতিক চাপে রয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য আরও তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন। তবে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা, যাতায়াতে বিধিনিষেধ এবং আটকের ঘটনা আন্দোলনটির রাজনৈতিক গুরুত্বকে সামনে এনেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অভিযোগের নিষ্পত্তি, নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা এবং আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ—এসবের ওপরই নির্ভর করবে বিতর্কটি কোন দিকে এগোয়।