বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষা করানোর শর্ত দিয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সেই শর্তের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। ২০১২ সালে আইএমএফের ঋণ চুক্তির আওতায় ২৮০ মিলিয়ন ডলার ছাড়ের অন্যতম শর্ত ছিল বিপিসির হিসাব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষা করা। তৎকালীন সরকার শুরুতে এতে আপত্তি জানালেও পরে শর্ত পূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু পরবর্তী সময়েও আন্তর্জাতিক অডিট আর হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অস্বচ্ছতা, অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি ও আর্থিক হিসাব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও স্বাধীন আন্তর্জাতিক নিরীক্ষার মাধ্যমে বিপিসির আর্থিক চিত্র যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
বিপিসির নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। এ সময়ে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা লভ্যাংশ, কর ও অন্যান্য খাতে সরকারকে দিয়েছে বিপিসি। তবে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে চলতি সময়ে বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেই লোকসানের কথা উল্লেখ করে ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এতে ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হলেও বিপিসির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা ও বর্তমান লোকসানের হিসাব নিয়ে স্বচ্ছতার দাবি জোরালো হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে বিপিসির আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়েও। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হলেও বিপিসির হিসাবে তাদের আমদানির পরিমাণ ছিল সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানি করা জ্বালানি তেল যুক্ত করলে অঙ্কটি দাঁড়ায় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যে বন্দরে শুল্কায়িত মোট আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের মূল্য ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। সরকারি তিন প্রতিষ্ঠানের তথ্যে এমন পার্থক্য থাকায় প্রকৃত আমদানির পরিমাণ ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
বিপিসির পুরোনো অডিট আপত্তিতেও বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য রয়েছে। ২০২২ সালে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ২০০৯-১০, ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছরের অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। একটি আপত্তিতে বিপিসির ব্যালান্সশিটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে দেওয়া ঋণের অঙ্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যালান্সশিটে দেখানো অঙ্কে ২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকার গরমিল পাওয়া যায়। একই সময়ে বিপিসির তেল কেনাকাটা, অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে সংসদীয় কমিটিও বিস্ময় প্রকাশ করেছিল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বিপিসির হিসাব-নিকাশে অস্বচ্ছতার অভিযোগ বরাবরই রয়েছে। হিসাব-নিকাশে অস্বচ্ছতা না থাকলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে অডিটের বিষয়টি আসত না। তাঁর মতে, সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় একটি জায়গা এবং ভোক্তার অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় বিপিসির হিসাবের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। কেপিএমজি বাংলাদেশের পার্টনার আশরাফ জামান আলীও প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে স্বাধীন নিরীক্ষার মাধ্যমে সংস্কারের জায়গাগুলো চিহ্নিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিপিসির জ্বালানি তেল আমদানিতে সিন্ডিকেট ও প্রিমিয়াম বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জিটুজি চুক্তির বাইরে দরপত্রে ঘুরেফিরে চার-পাঁচটি কোম্পানিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিপিসির সাবেক এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, শুধু প্রিমিয়াম ক্রয়েই বছরে ৪-৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা রয়েছে।
অন্যদিকে অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ মনে করেন, ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করে এমন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অডিটের মান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত করা প্রয়োজন। এতে জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয়ও কমানো সম্ভব হবে।
দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক অডিট না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিপিসির সাবেক কর্মকর্তারাও। ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিপিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা আমিন উল আহসান জানান, আন্তর্জাতিক ফার্ম দিয়ে অডিটের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তিনি নিজে বিপিসির স্বচ্ছতার জন্য কস্ট অডিটের বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও তা আর এগোয়নি।
তবে বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেছেন। আইনগত দিক ঠিক রেখে আন্তর্জাতিক মানে নিরীক্ষা কীভাবে করা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে।