দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ঘোষিত ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগসেবায় ২০টি উদ্যোগের অগ্রগতি হয়েছে। পরিকল্পনার মেয়াদ শেষে অর্জিত অগ্রগতি নিয়ে সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করেছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ও অর্থনীতির সামগ্রিক খাত থেকে সম্ভাব্য ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগের একটি পাইপলাইন তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, বন্দরে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম, সমন্বিত বিনিয়োগসেবা এবং বিদেশি বিনিয়োগে নতুন প্রণোদনাও চালু রয়েছে।
এরই মধ্যে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারের বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৮০ দিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে উন্নত অবকাঠামো, দ্রুত ও কার্যকর সেবা এবং বিনিয়োগযোগ্য সুযোগের শক্তিশালী পাইপলাইনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু পরিবর্তন এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে। তবে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও সময় লাগবে।
জানা যায়, দেশি-বিদেশীদের বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা আরও সহজ করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম একীভূত করে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। উন্নয়ন মূলক দেশের অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত উদ্যোগগুলোর অন্যতম ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছে। এপিএম টার্মিনালস ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে। এটি চালু হলে ৭০০’র বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়বে।
এ প্রসঙ্গে বিডার নির্বাহী সদস্য এবং ব্যবসা উন্নয়ন প্রধান নাহিয়ান রহমান রোচি জানান, দেশের উন্নয়নমূলক ২০টি উদ্যোগকে তিনটি বড় স্তম্ভের অধীনে নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—শক্তিশালী অবকাঠামো, বিনিয়োগে সহায়তা এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন। তিনি জানান, পাঁচটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অধীনে ১০ হাজার একরের বেশি শিল্প জমিতে ৪৪টি বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে একটি পোর্টফোলিও তৈরির কাজও চলছে। একই সঙ্গে চীনে বিনিয়োগ প্রচার ও যোগাযোগ বাড়াতে গুয়াংজুতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের একটি কার্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এই শিল্পাঞ্চলে এক লাখের বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হতে পারে। প্রকল্পটির বিনিয়োগ পাইপলাইনের পরিমাণ প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ইতিমধ্যে সক্রিয় রয়েছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য বিনিয়োগের উৎসের মধ্যে চীন থেকে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। খাতভিত্তিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে এবং স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র খাতে ২০০ মিলিয়ন ডলার করে সম্ভাব্য বিনিয়োগ বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
সরকারের এসব নানামুখী উদ্যোগে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অবকাঠামো প্রয়োজন- এ কথা এখন আর বিতর্কের বিষয় নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা যে অবকাঠামো তৈরি করি, সেটি কতদিন কার্যকর রাখতে পারি। নতুন সড়ক বা নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ উন্নয়নের দৃশ্যমান চিহ্ন হতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির প্রকৃত ভিত্তি হলো এমন অবকাঠামো, যা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ পায় এবং অর্থনীতিকে প্রতিদিন তার পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে সাহায্য করে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানায়, দেশে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হচ্ছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশ ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি করেছে। এর মধ্যে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ ইতিমধ্যে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। দেশভিত্তিক সম্ভাব্য বিনিয়োগের মধ্যে চীন থেকে ৬০ কোটি ডলার, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০ কোটি ডলার, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ কোটি ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০ কোটি ডলার আসতে পারে। খাতভিত্তিক হিসাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রায় ৩০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র খাতে রয়েছে ২০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা।
তথ্যমতে, চলতি অর্থ বছরের প্রথম প্রনান্তিকে আসছে ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের পাইপলাইন। এদের মধ্যে রয়েছে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, প্রথম সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ), বাংলাবিজ বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মের সম্প্রসারণ, চীনের গুয়াংজুতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয় স্থাপন এবং দেশব্যাপী শিল্প খাতের ম্যাপিং। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় পরিচালনার জন্য আগামীকাল বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে একটি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
সরকারে পরিকল্পণা অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বন্দর ও লজিস্টিকস অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড এই কনসেশন ব্যবস্থায় যুক্ত থাকবে। চুক্তিটি বাংলাদেশের বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসুবিধা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে পিপিপি কাঠামোর আওতায় এনসিটির পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানের পরিচালন পদ্ধতি যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করবে। আগামীতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। এটি চালু হলে বিমানবন্দরের বার্ষিক কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ২ লাখ টন থেকে বেড়ে ৫ লাখ টনে দাঁড়াবে। অর্থাৎ সক্ষমতা বাড়বে ১৫০ শতাংশ। এ টার্মিনাল থেকে ৬ হাজারের বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানও হবে।
সরকারের বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি বৃহৎ স্বপ্নের সঙ্গে বড় সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব দুর্বলতা মোকাবিলা, শিল্পখাত পুনরুজ্জীবন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে কাঠামোগত বড় সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনের জন্য ৬০০ বিলিয়ন টাকা বা ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে। চলতি মাস থেকেই এ অর্থ ছাড় শুরু হতে পারে বলেও জানান তিনি। মূল্যস্ফীতি নিয়েও সরকারের লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, বর্তমানে ৮ শতাংশের বেশি থাকা মূল্যস্ফীতি কমিয়ে প্রায় ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। এটিকে একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য টেকসই মাত্রা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।