রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা ও হত্যার হুমকির ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বন্ধে রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং দলীয় সংস্কার ও আত্মশুদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
সোমবার (৫ অক্টোবর) এক প্রতিক্রিয়ায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, হামলার শিকার সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। হামলাকারী, তাদের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে রেখে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে পুলিশের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি।
গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এর মাধ্যমে ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির সুযোগও সংকুচিত হয়। তাই এ ধরনের ঘটনার প্রতিকার রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে টিআইবি জানায়, রোববার (৪ অক্টোবর) রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। হামলার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন এবং পুলিশও পরিস্থিতির মধ্যে পালিয়ে যায় বলে তার বক্তব্যে উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি ছাত্রদলও দলীয়ভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে সাংবাদিকেরা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান নিয়েছেন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহায়ত্ব ও পুলিশের ব্যর্থতা শুধু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে ক্যাম্পাসে ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার, সহিংসতা, দখলবাজি ও পেশিশক্তির প্রদর্শনের মতো বৃহত্তর সংকট রয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় প্রভাবের কারণে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এমনভাবে ক্ষমতাবান হয়ে উঠবে যে প্রশাসন দায়িত্ব পালনে অক্ষম হবে এবং পুলিশ আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হবে—এ পরিস্থিতি কোনোভাবেই চলতে দেওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হতে হবে আইন ও বিধি অনুযায়ী, দলীয় শক্তির দাপটে নয়।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শুধু তদন্ত কমিটি গঠন বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সহিংসতায় প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পরিবেশ তৈরি এবং দলীয় সিদ্ধান্ত ও আচরণে গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে দায় নির্ধারণেরও দাবি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, রাজনৈতিক চাপ বা অসহায়ত্বের অজুহাতে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধের সুরক্ষাকবচ না হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারে—এ নিশ্চয়তা সরকারকেই দিতে হবে।