ঘোড়ার পেছনে মই, সামনে সংসার—শফিকুলের নীরব লড়াই

সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা

সারাদেশ

মাঠজুড়ে এখন আধুনিকতার ছোঁয়া। ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার আর নানা কৃষিযন্ত্রের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে গরু-ঘোড়া দিয়ে জমি চাষের সেই পুরোনো

2026-10-05T15:23:51+00:00
2026-10-05T15:23:51+00:00
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
 
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
ঘোড়ার পেছনে মই, সামনে সংসার—শফিকুলের নীরব লড়াই
সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা
সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:২৩ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
মাঠজুড়ে এখন আধুনিকতার ছোঁয়া। ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার আর নানা কৃষিযন্ত্রের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে গরু-ঘোড়া দিয়ে জমি চাষের সেই পুরোনো দৃশ্য। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা যেন শফিকুল ইসলামকে আটকে রেখেছে সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের কাছেই।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের বড়ইচড়া গ্রামের এই কৃষকের একমাত্র সম্বল একটি ঘোড়া। সেই ঘোড়াকে সঙ্গী করেই অন্যের জমিতে হাল চাষ ও মই দেওয়ার কাজ করে চলছে তাঁর সংসার। আধুনিক কৃষির ভিড়ে পুরোনো এই পদ্ধতিই তাঁর কাছে শুধু ঐতিহ্য নয়, বেঁচে থাকার অবলম্বন।

প্রায় পাঁচ বছর আগে অভাবের সংসারে ধারদেনা করে ২৪ হাজার টাকায় একটি ঘোড়া কিনেছিলেন শফিকুল। এক জোড়া হালের বলদ কেনার সামর্থ্য ছিল না তাঁর। তাই ঘোড়াটিকেই কাজে লাগিয়ে শুরু করেন অন্যের জমিতে হাল চাষ ও মই দেওয়ার কাজ।

এরপর ধীরে ধীরে ঘোড়াটিই হয়ে ওঠে তাঁর পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান ভরসা।

ঘোড়ার পেছনে মই, সামনে জীবিকার লড়াই

সম্প্রতি তালম ইউনিয়নের গোন্তা গ্রামের একটি মাঠে দেখা যায়, ঘোড়ার পেছনে মই বেঁধে জমির মাটি সমান করছেন শফিকুল। চারপাশে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার থাকলেও তিনি ব্যস্ত নিজের পুরোনো পদ্ধতিতেই।

মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘোড়াটি এগিয়ে যাচ্ছে, আর তার পেছনে মই দিয়ে জমির মাটি সমান করছেন শফিকুল। দৃশ্যটি যেন গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা কৃষিজীবনের এক টুকরো ছবি।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঘোড়াটি শুধু কাজের প্রাণী নয়, এটি আমার সংসারে আয়ের সঙ্গী। তাই নিজের সন্তানের মতোই এর যত্ন করি।’

তিনি জানান, বছরজুড়েই অন্যের জমিতে মই দেওয়ার কাজ করেন। প্রতি বিঘা জমিতে মই দেওয়ার জন্য পান ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। দিনে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বিঘা জমিতে মই দিতে পারেন তিনি।

এই সামান্য আয় দিয়েই চলে তাঁর সংসারের খরচ। কাজ শেষে নিজের ঘোড়াটির খাবার ও পরিচর্যার দায়িত্বও পালন করেন তিনি নিজ হাতেই।

জীবিকার জন্য যে ঘোড়াটিকে মাঠে নিয়ে যান শফিকুল, কাজ শেষে সেটির প্রতিও তাঁর মমতার কমতি নেই। নিজের হাতে খাবার দেন, পরিচর্যা করেন। তাঁর কাছে ঘোড়াটি কেবল উপার্জনের মাধ্যম নয়—দীর্ঘদিনের সংগ্রামের সঙ্গী।

অভাবের সংসারে একসময় একটি বলদ কেনার সামর্থ্যও ছিল না। সেই জায়গা থেকে ধারদেনা করে কেনা ঘোড়াটিই আজ তাঁর পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

আধুনিক কৃষি যত এগিয়ে যাচ্ছে, ততই হারিয়ে যাচ্ছে এমন দৃশ্য। কিন্তু শফিকুলের জীবনে এই পুরোনো কৃষিপদ্ধতিই এখনও টিকে থাকার লড়াই।

তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, ঘোড়া দিয়ে জমিতে মই দেওয়ার ঘটনা এখন খুবই বিরল। বড়ইচড়া গ্রামের শফিকুল এখনও সেই পুরোনো পদ্ধতি ধরে রেখেছেন বলে তিনি শুনেছেন।

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, ঘোড়া দিয়ে কৃষিকাজ করে একজন কৃষক জীবিকা নির্বাহ করছেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে তাঁর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আধুনিক কৃষির যন্ত্রের শব্দে যখন হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার চিরচেনা অনেক দৃশ্য, তখন শফিকুলের ঘোড়ার পায়ের শব্দ যেন সেই পুরোনো দিনেরই স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। তবে এই স্মৃতির আড়ালে আছে এক কৃষকের নির্মম বাস্তবতা—সংসার চালাতে আজও তাঁকে আঁকড়ে ধরতে হয়েছে হারিয়ে যেতে বসা সেই ঘোড়ার হাল।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: