সংকটের মধ্যেও দেশের রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। এরই মধ্যে প্রবাসী আয়ও কাটিয়ে উঠছে খরা। তবে এখনো রিজার্ভ ও ডলার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স ও পণ্য রপ্তানি— দুই খাতেই বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের নানা রকম সংকটের মধ্যেও রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে স্বস্তির দেখা মিলেছে।
তথ্যমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর সুবিধা বাড়ানো এবং ডলারের আনুষ্ঠানিক দর তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের প্রবাহ মোটের ওপর ইতিবাচক রয়েছে। মাসভিত্তিক ওঠানামা থাকলেও এই প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও রিজার্ভে স্বস্তি ধরে রাখতে ভূমিকা রাখছে। ফলে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের এই ইতিবাচক ধারা এখন দেশের অর্থনীতির জন্য স্বস্তিজনক।
জানা যায়, রপ্তানি বাজারের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ২৫৯ কোটি ১৬ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পণ্য। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ২৩২ কোটি ৭৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার যুক্তরাজ্য। প্রথম তিন মাসে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ১৩৭ কোটি ২ লাখ ডলারের পণ্য। তৃতীয় অবস্থানে থাকা জার্মানিতে রপ্তানি হয়েছে ১২১ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার ডলারের পণ্য। অপরদিকে, রেমিট্যান্সে হয়েছে নতুন রেকর্ড। এরই মধ্যে গত অর্থবছরে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা মোট ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। ১২ মাসের মধ্যে ছয় মাসেই ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। এর আগের অর্থবছরেও প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়েছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। ওই অর্থবছরেই প্রথমবারের মতো এক বছরে প্রবাসী আয় ৩ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরের অর্থবছরে সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যায়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য অনুয়ায়ী, এরই মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি খাতের সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টি তুলে ধরেছে। এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, নতুন বাজারে প্রবেশ, পণ্যের মানোন্নয়ন এবং বাণিজ্য সহজীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সভাপতি ফজলে এহসান শামীম বলেন, আগস্টে পুরো মাস জ্বালানি সংকটে ছিল, তারপরেও সেপ্টেম্বরের এই রপ্তানির প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বেশিরভাগ কারখানা সংকটে থাকার পরেও নিশ্চয় কেউ কেউ নিজ দক্ষতায় অতি রপ্তানি করার কারণেই এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে আমি মনে করি।
ইপিবির দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ ও রপ্তানি আয় বাড়ার প্রভাবে বিদায়ি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশি লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টে (বিওপি) উন্নতি ঘটেছে। বিওপির যে হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছে, তাতে বাণিজ্য ঘাটতি বেশ কমেছে। এতে অর্থনৈতিক সংকটেও স্বস্তি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এরই মধ্যে বলেছেন, ব্যালান্স অব পেমেন্টের সার্বিক চিত্রে উন্নতি হয়েছে। তবে সূচকগুলোর উন্নতির সঙ্গে রয়েছে কিছু নেতিবাচক দিক। আর বর্তমানে যেসব সূচক উন্নতি হয়েছে, সামনে নেতিবাচক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ সামনেও ধরে রাখতে হবে। এ বিষয়ে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, রপ্তানি আয় বাড়ছে, যা দেশের জন্য ভালো, তবে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট সমাধান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে শূন্য সহনশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধান জরুরি।
অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয় রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। প্রবাসী আয়ও কাটিয়ে উঠছে খরা। এই ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে পারলে রিজার্ভ ও ডলারের ওপর চাপ ধীরে ধীরে কমবে। তারা বলছেন, এটা একটা সুখবর। তবে এখনই এটা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। কমপক্ষে ছয় মাস এই ধারা অব্যাহত থাকলে ইতিবাচক দিকগুলো আরও স্পষ্ট হবে। আর এখন আমদানি কমিয়ে রিজার্ভের ওপর চাপ কমানোর কৌশল শেষ পর্যন্ত নেতিবাচক হতে পারে। রপ্তানিকারকেরা বলছেন, পোশাক রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি শুধু সংখ্যার সঙ্গে নয়, শিল্পের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। যা দেশের প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং এটিকে টেকসই করবে। তারা বিশ্বাস করেন, দেশের পোশাক খাতের সাফল্য এবং প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সরকার যেন প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করে। যাতে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিরাপদ এবং স্থিতিশীল থাকে। তাদের মতে, একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশই দেশের পোশাক খাতকে বিশ্বের মঞ্চে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। যা শুধু আয়ের ধারাকে দীর্ঘায়িত করবে না, বরং দেশের অর্থনীতিরও প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে।
এ ব্যাপারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ছয় মাসে সাড়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বড় কারণ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি ও সে কারণে চূড়ান্ত পণ্যেরও দাম বেড়ে যাওয়া। রপ্তানি পণ্যের স্থানীয় মূল্য সংযোজনের প্রবৃদ্ধি ততটা হয়নি। তিনি বলেন, মাঝে দু-তিন মাস ক্রয়াদেশ কম এসেছে। রপ্তানিতে সেটির প্রভাব ফেব্রুয়ারি-মার্চে পড়বে। বাংলাদেশের প্রধান বাজারগুলোতে মন্দার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তাই আগামীতে রপ্তানি খাত যেন গ্যাস-বিদ্যুৎ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।