খুনের সিদ্ধান্ত নেয় একজন। টাকার ব্যবস্থা করে আরেকজন। টার্গেটের অবস্থান ও চলাফেরার তথ্য দেয় তৃতীয় ব্যক্তি। আর শেষ কাজটি করে কয়েকজন ভাড়াটে খুনি। কাজ শেষে তারা ফিরে যায় নিজেদের এলাকায়, কেউ রাজধানী ছেড়ে জেলা শহরে, কেউবা সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে। হত্যাকান্ডের সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পর্কও থাকে না পরিকল্পনাকারীর।
রাজধানী ঢাকায় সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকান্ডের তদন্তে এমনই এক অপরাধচিত্র সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে কোথাও মাগুরা-ঝিনাইদহ থেকে শুটার আনার তথ্য, কোথাও খুলনা থেকে হামলাকারী এনে রাজধানীতে হত্যার অভিযোগ, আবার কোথাও নেপথ্যে থাকা অপরাধী চক্রের সদস্যের মাধ্যমে খুনের পরিকল্পনার তথ্য এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, খুন কি এখন অপরাধ জগতের ‘আউটসোর্সড’ সেবা হয়ে উঠছে?
জুলাইয়ে রাজধানীর কফরুলে যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে বাইরে থেকে চারজনকে আনার অভিযোগটি সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি। ডিবি বলেছে, মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে চার কথিত ভাড়াটে খুনি ঢাকায় আসে। তারা মিরপুরের একটি হোটেলে অবস্থান করে। কিন্তু লক্ষ্য ব্যক্তিকে হত্যার আগেই গুলিতে নিহত হন যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী। এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হত্যাচেষ্টার পেছনে ছিল স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্ব। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ, সড়কের পাশের দোকান, ইন্টারনেট-ক্যাবল ব্যবসা ও জমি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধের কথাও তদন্তে উঠে এসেছে। তবে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
ঢাকার খুনে ঢুকছে ‘বাইরের লোক’ : কফরুলের ঘটনা একা নয়। চলতি বছরের মার্চে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাকিবুল হাসান রাকিব হত্যার তদন্তেও পুলিশ বলেছিল, খুলনা থেকে হামলাকারীদের ঢাকায় আনা হয়েছিল। ডিএমপির ভাষ্য অনুযায়ী, এক ব্যক্তির স্ত্রীর সঙ্গে রাকিবের যোগাযোগ নিয়ে সন্দেহ থেকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এবং কথিত ভাড়াটে হামলাকারীরা ঢাকায় এসে কয়েক দিন অবস্থান করে টার্গেটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে।
পুলিশের তদন্তে পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হলেও কথিত শুটার আলামিন তখনও পলাতক ছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, হামলায় কেউ সরাসরি অংশ নেয়, কেউ অস্ত্র ও অবস্থান ঠিক করার মতো লজিস্টিক সহায়তা দেয়, আবার কেউ ঘটনাস্থলে ব্যাকআপ হিসেবে থাকে। অর্থাৎ একটি হত্যাকান্ডকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করে বাস্তবায়নের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
এ ধরনের কাঠামো তদন্তকে জটিল করে তুলছে। কারণ ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তি সব সময় হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী নাও হতে পারেন। আবার পরিকল্পনাকারী নিজে ঘটনাস্থলে না থাকায় প্রত্যক্ষ প্রমাণের ঘাটতিও তৈরি হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. সায়েদুর রহমান ভোরের ডাককে বলেন, চিহ্নিত ও অভ্যাসগত অপরাধীরা যেন দেশে কোনো অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালাতে না পারে, সে জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তিনি জানান, সব ঘটনা পরিকল্পিত না হলেও যেসব অপরাধ পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হচ্ছে, সেসবের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত অপরাধীদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এদিকে ভাড়াটে খুনিদের তৎপরতা ঠেকাতে রাজধানীসহ সারাদেশে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
২৫ লাখ টাকার কথিত চুক্তি : কফরুলের ঘটনায় তদন্তকারীরা কথিত ২৫ লাখ টাকার চুক্তির তথ্য পেয়েছেন বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে। চারজন শুটারকে মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে আনার অভিযোগ করা হয়েছে। নির্ধারিত ব্যক্তিকে না পেয়ে অন্য একজন নিহত হওয়ায় ‘কন্ট্রাক্ট কিলিং’-এর ঝুঁকির আরেকটি ভয়াবহ দিকও সামনে এসেছে, টার্গেট একজন হলেও প্রাণ যেতে পারে সম্পূর্ণ নিরপরাধ বা ভুল ব্যক্তির।
এর আগে জানুয়ারিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যার তদন্তে ডিবি বলেছিল, বিদেশে থাকা এক অপরাধীর সহযোগী কথিতভাবে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে আরও কয়েকজন শুটারকে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ চুক্তির অঙ্ক একেক ঘটনায় একেক রকম হলেও কাঠামোয় একটি মিল দেখা যায়, অর্থদাতা বা পরিকল্পনাকারী সামনে নেই; হামলাকারী আলাদা; আর মাঝখানে থাকে সমন্বয়কারী।
২৯ সেপ্টেম্বরের ঘটনাতেও উঠল ‘পেশাদার খুনি’র সন্দেহ : চুক্তিভিত্তিক হত্যার আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে কক্সবাজারের চকরিয়ায় ছাত্রদল নেতা ইসফাতুল ইসলামের হত্যার ঘটনায়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভোরে সড়কের পাশে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে অপহরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হত্যা করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি রাজনৈতিক কারণে হয়েছে বলে মনে করছে না পুলিশ, বরং এক নারীকে ঘিরে আর্থিক লেনদেন ও সম্পর্কের বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের ভাষ্য, ওই নারীর ভাইদের সঙ্গে ভুক্তভোগীর বিরোধ ও হুমকির তথ্য রয়েছে এবং পেশাদার খুনি ভাড়া করার সন্দেহ তদন্তে এসেছে। তবে এ ঘটনায় এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তদন্ত, প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং মামলা প্রক্রিয়াধীন।
অপরাধের নতুন ‘চেইন’ : সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে হত্যাকান্ডের একটি সম্ভাব্য চেইন চোখে পড়ে— পরিকল্পনাকারী, মধ্যস্থতাকারী, টার্গেট শনাক্তকারী, শুটার, পালানোর সহযোগী। কোনো কোনো ঘটনায় হামলাকারীকে অন্য জেলা থেকে আনা হচ্ছে। রাজধানীতে এসে তারা হোটেলে থাকছে, টার্গেটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে, সুযোগ বুঝে হামলা চালিয়ে আবার এলাকা ছাড়ছে। কফরুল ও শহীদ মিনারের ঘটনায় পুলিশের বক্তব্যে এই ধরনের গতিবিধির তথ্য পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রামেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকান্ডে অপরাধী নেটওয়ার্ক ও কথিত ভাড়াটে শুটারদের যোগসূত্রের কথা জানিয়েছে। একটি প্রতিবেদনে পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, একটি অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত কয়েক ডজন শুটার ও সহযোগীর সক্রিয়তার তথ্য তদন্তে এসেছে। এতে অপরাধী নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, নিজেদের এলাকার লোক দিয়ে কাজ করানোর বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য এলাকা থেকে লোক আনা। এতে পরিচিতি কম থাকে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা সহজ হয় এবং তদন্তে মূল পরিকল্পনাকারীর কাছে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
খুনি ধরা পড়লেই কি শেষ হয় তদন্ত? বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তিভিত্তিক হত্যার ক্ষেত্রে শুধু অস্ত্রধারী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করলেই তদন্ত শেষ হওয়ার কথা নয়। খুঁজতে হয় অর্থের উৎস, যোগাযোগের মাধ্যম, মধ্যস্থতাকারী, অস্ত্র সরবরাহকারী এবং হত্যার নির্দেশদাতাকে। সাম্প্রতিক মামলাগুলোতেও তদন্তকারীরা মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, কল ডিটেইল রেকর্ড ও ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করছেন। কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন, এই নেটওয়ার্কের কতটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আছে? কারণ একজন শুটার গ্রেপ্তার হলেও যদি অর্থদাতা অদৃশ্য থাকেন, একজন সমন্বয়কারী ধরা পড়লেও যদি নির্দেশদাতা ধরা না পড়েন, তাহলে একটি হত্যার তদন্ত হয়তো শেষ হবে; কিন্তু হত্যার বাজার বন্ধ হবে না।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অন্তত সেই আশঙ্কাই সামনে আনছে। খুনের জন্য অস্ত্র, মানুষ ও পরিকল্পনা, সবকিছু যদি টাকার বিনিময়ে জোগাড় করা যায়, তাহলে ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব কিংবা আধিপত্যের সংঘাত, যেকোনো বিরোধই ভয়ংকর পরিণতি পেতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি তাই শুধু ‘কে গুলি করল’ নয়। প্রশ্ন হলো, কে টাকা দিল, কে নির্দেশ দিল, কে লোক জোগাড় করল এবং কে নিশ্চিত করল যে খুনের পর সবাই নিরাপদে সরে যেতে পারবে। সাম্প্রতিক হত্যাকান্ডগুলোর তদন্তে এই চার প্রশ্নের উত্তর যতটা স্পষ্ট হবে, ততটাই পরিষ্কার হবে দেশের অপরাধজগতে ‘চুক্তিভিত্তিক গ্যাং’ কতটা সংগঠিত হয়ে উঠেছে।