ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ক্রমেই সহিংস রূপ নিয়েছে। শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, দীর্ঘ ক্লাস সূচি ও শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির বিভিন্ন শহরে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুক্রবার (২ অক্টোবর) প্রায় ৪০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। আন্দোলন ঘিরে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
প্যারিস অঞ্চলে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ পরে মার্সেই, নঁত, স্ট্রাসবার্গ, তুলুজ, লিলসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও স্কুল অবরোধ, কোথাও অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বেশ কয়েকটি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষও হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জরুরি বৈঠক করেছেন।
ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর এক হাজারের বেশি হাইস্কুল কোনো না কোনোভাবে আন্দোলনের প্রভাবের মধ্যে পড়ে। এর মধ্যে ২২২টি স্কুলে অবরোধ ছিল। পরদিন প্রায় ৪০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বন্ধ থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানে দূরশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক স্কুলে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি স্কুল ভবনের অবস্থা, অতিরিক্ত দীর্ঘ ক্লাস সূচি ও শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি একাডেমিক চাপ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে।
বিক্ষোভের কয়েকটি কর্মসূচিতে স্কুলের সামনে আগুন জ্বালানো, সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। নঁতসহ কয়েকটি শহরে স্কুলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। স্ট্রাসবার্গে একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং তুলুজ ও অন্যান্য শহরে দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ১ অক্টোবর এক দিনেই ১ হাজার ৯৪৯ জনকে আটক করা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আন্দোলন শুরুর পর মোট আটকের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার থেকে প্রায় তিন হাজারের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে—সময় ও গণনার পদ্ধতির পার্থক্যের কারণে সংখ্যায় ভিন্নতা রয়েছে।
আন্দোলন ঘিরে পুলিশ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা খাতের কর্মীরাও আহত হয়েছেন। ১ অক্টোবরের সংঘর্ষে ফরাসি কর্তৃপক্ষ ৩০৫ জন পুলিশ, জেন্ডারম ও ফায়ার সার্ভিস সদস্য আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে আন্দোলন শুরুর পর ১৭০ শিক্ষার্থী এবং ৬৫ জন শিক্ষা খাতের কর্মী আহত হয়েছেন।
একই সঙ্গে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রণমূলক অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তও শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
সহিংসতা বাড়লেও সরকার শিক্ষার্থীদের কিছু দাবিকে বৈধ বলে স্বীকার করেছে। তবে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষকে জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে তারা। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন।
আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বামপন্থি দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের (LFI) কিছু রাজনীতিকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। দলটির আইনপ্রণেতা লুই বোয়ার্ড এ অভিযোগ অস্বীকার করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পক্ষে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংক্রান্ত দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন ফ্রান্সজুড়ে বড় ধরনের জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে রূপ নিয়েছে। একদিকে শিক্ষা খাতের সংকট নিয়ে আলোচনার চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সহিংসতা ও ব্যাপক আটকের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।