শ্রেণিকক্ষের জানালার পাশেই ময়লার বিশাল স্তূপ। চারদিকে দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব। নোংরা পানি ও আবর্জনায় তৈরি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এমন পরিস্থিতিতে খুলনার পাইকগাছার শতবর্ষী কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দির স্কুল অ্যান্ড কলেজের পূর্ব পাশের একটি দ্বিতল ভবনে প্রায় ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বারবার ময়লা অপসারণ করা হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই সেখানে ফের আবর্জনা ফেলা হয়। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের একাধিকবার জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দির স্কুল অ্যান্ড কলেজে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৮০৩ জন। এর পাশেই রয়েছে কপিলমুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যেখানে পড়াশোনা করছে আরও ৫৩৫ শিক্ষার্থী। দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঝের চলাচলের পথ ও একাডেমিক ভবনসংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আবর্জনা জমে থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যামন্দিরের পূর্ব পাশের একাডেমিক ভবনের গা ঘেঁষে একটি খালি জায়গায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। ওই স্থানের পাশেই রয়েছে শহীদ মিনার। পার্শ্ববর্তী একটি বহুতল ভবনের নিচতলায় পরিচালিত হচ্ছে কপিলমুনি ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম। ময়লার ভাগাড়টি ওই পরিষদ কার্যালয়ের পেছনেই।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, আবর্জনার দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে পূর্ব পাশের দ্বিতল ভবনটির শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ রাখতে হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, কয়েক মাস আগেও ওই ভবনে তাদের ক্লাস হতো। কিন্তু দুর্গন্ধ ও মশার উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় তাদের অন্য ভবনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় কুমার মণ্ডল বলেন, ‘আমরা লোকজন দিয়ে একাধিকবার ময়লা-আবর্জনার স্তূপ পরিষ্কার করেছি। কিন্তু কিছুদিন পর আবার আগের মতো হয়ে যায়। পার্শ্ববর্তী ভবনের একটি পাইপ ফেটে নোংরা পানি বিদ্যালয়ের দেয়ালের পাশে পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেও কার্যকর সমাধান পাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে দ্রুত ময়লার স্তূপ স্থায়ীভাবে অপসারণ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা চাই।’
বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ময়লার বিষয়টি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কর্মকর্তারা সরেজমিনে এসে পরিস্থিতি দেখে গেলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ময়লার কারণে বিদ্যালয়ে মশা ও মাছির উপদ্রবও বেড়েছে।
পার্শ্ববর্তী কপিলমুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ওই জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এখন এটি ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। আবর্জনা আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। দুর্গন্ধে বিদ্যালয়সহ আশপাশের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।’
অভিভাবকদের অভিযোগ, টিফিনের সময় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের আশপাশে খেলাধুলা করে। কিন্তু ময়লা ও দুর্গন্ধের কারণে তারা স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলা করতে পারছে না। এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সুজন বলেন, ‘স্কুলের এই পাশ দিয়ে যাতায়াত করলে নাক-মুখ চেপে ধরতে হয়। স্কুলের বাচ্চাগুলো কীভাবে এই গন্ধের মধ্যে ক্লাস করে, ভগবানই জানেন।’
বিদ্যালয়ের নবগঠিত ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য এস এম মুস্তাফিজুর রহমান পারভেজ বলেন, ‘বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রথম দিনই বিষয়টি আমার নজরে আসে। প্রধান শিক্ষক, অন্যান্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখেছি। পার্শ্ববর্তী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গেও কথা বলেছি। পরে ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।’
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও একাধিকবার বিষয়টি জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান হয়নি।
এ বিষয়ে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, বিষয়টি জানার পর দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের দাবি, শতবর্ষী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ময়লার ভাগাড় রেখে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ভোগান্তি বিবেচনায় দ্রুত আবর্জনার স্তূপ অপসারণ এবং ভবিষ্যতে সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।