রাতারগুলে সৌন্দর্যের হাতছানি, ব্যবস্থাপনায় বড় ঘাটতি

গোয়াইনঘাট (সিলেট) সংবাদদাতা

সারাদেশ

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য আধার সিলেটের গোয়াইনঘাটের রাতারগুল। মিঠাপানির এই জলাবন বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকা গাছপালা, নৌকায় বনের ভেতর

2026-09-27T19:29:30+00:00
2026-09-27T19:29:30+00:00
  সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
রাতারগুলে সৌন্দর্যের হাতছানি, ব্যবস্থাপনায় বড় ঘাটতি
লাইফ জ্যাকেট নেই, ঝুঁকিপূর্ণ ওয়াচ টাওয়ার, যানজটে ভোগান্তি; নেই পর্যটকের ধারণক্ষমতার সীমা
গোয়াইনঘাট (সিলেট) সংবাদদাতা
রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:২৯ পিএম 
রাতারগুলে সৌন্দর্যের হাতছানি, ব্যবস্থাপনায় বড় ঘাটতি
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য আধার সিলেটের গোয়াইনঘাটের রাতারগুল। মিঠাপানির এই জলাবন বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকা গাছপালা, নৌকায় বনের ভেতর ঘোরার সুযোগ এবং বৈচিত্র্যময় জীববৈচিত্র্যের কারণে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাতারগুলে প্রতিদিন কতসংখ্যক পর্যটক প্রবেশ করতে পারবেন, তার কোনো নির্ধারিত সীমা নেই। নৌযানে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহারও চোখে পড়েনি। একমাত্র ওয়াচ টাওয়ারটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি সড়কে খানাখন্দ, অপর্যাপ্ত পার্কিং ও যানজটে ছুটির দিনে পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, পর্যটনের চাপ জলাবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে, তা বিবেচনায় নিয়ে এখনো নির্ধারণ করা হয়নি রাতারগুলের ‘ক্যারিং ক্যাপাসিটি’ বা সহনীয় পর্যটক ধারণক্ষমতা।

রাতারগুলে সাধারণ দিনে তিন শতাধিক পর্যটকের আগমন ঘটে বলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। শুক্রবার ও শনিবার এই সংখ্যা পাঁচ শতাধিক হয়। বিশেষ দিনগুলোতে পর্যটকের চাপ আরও বাড়ে।

তবে স্থানীয় মাঝিদের হিসাবে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে রাতারগুলে প্রকৃতপক্ষে প্রতিদিন কত পর্যটক আসছেন, তা নিয়েও রয়েছে তথ্যের ব্যবধান।

এত বিপুলসংখ্যক পর্যটকের চাপ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর কতটা সহনীয়—সে বিষয়ে কোনো নির্ধারিত বৈজ্ঞানিক সীমা না থাকায় ভবিষ্যতে জলাবনের ওপর অতিরিক্ত পর্যটনচাপের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রাতারগুলের ১, ২ ও ৩ নম্বর ঘাট মিলিয়ে প্রায় ২৫০টি নৌকা চলাচল করে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। নৌকা চলাচল উপজেলা প্রশাসনের নির্ধারিত ব্যবস্থার আওতায় থাকলেও সরেজমিনে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহার দেখা যায়নি।

দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক উদ্ধার ব্যবস্থার বিষয়েও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিস ছাড়া রাতারগুলে আলাদা কোনো তাৎক্ষণিক উদ্ধারব্যবস্থা নেই। মাঝিদের প্রশিক্ষণ এবং নৌযান নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয়েও মাঠপর্যায়ে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

নৌকা ভাড়াও পর্যটকদের অভিযোগের অন্যতম বিষয়। ঢাকা থেকে সহপাঠীদের নিয়ে আসা শিক্ষার্থী নাঈম আহমেদ খান বলেন, তাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য নৌকা ভাড়া তুলনামূলক বেশি। ভাড়া কমানো গেলে আরও বেশি মানুষ রাতারগুল ভ্রমণের সুযোগ পেতেন।

ঝুঁকিপূর্ণ ওয়াচ টাওয়ার, তিন বছর ধরে বন্ধ

রাতারগুলের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বনের ভেতরে থাকা ওয়াচ টাওয়ার। ২০১৪ সালে দর্শনার্থীদের জলাবনের বিস্তৃত সৌন্দর্য দেখার সুযোগ করে দিতে এটি নির্মাণ করে বন বিভাগ।

তবে নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই টাওয়ারটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বর্তমানে পর্যটকদের সেখানে ওঠা নিষিদ্ধ। সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে আছে ওয়াচ টাওয়ারটি।

রাজবাড়ী থেকে আসা সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) জাহিদ উদ্দিন মোল্লা বলেন, রাতারগুলের সৌন্দর্য অসাধারণ। কিন্তু একমাত্র ওয়াচ টাওয়ারটিও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ওপর থেকে জলাবনের দৃশ্য উপভোগের সুযোগ নেই। সংরক্ষিত এই জলাবনে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক ওয়াচ টাওয়ার প্রয়োজন।

বন বিভাগ জানিয়েছে, পুরোনো ওয়াচ টাওয়ারটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রায় তিন বছর ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। নতুন একটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাতারগুলের সংরক্ষিত অংশে বড় ধরনের শব্দদূষণ সরেজমিনে চোখে না পড়লেও বনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গোয়াইন-চেঙ্গেরখাল নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দ বনের গভীর অংশ পর্যন্ত শোনা যায়।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দে অনেক সময় জলজ প্রাণী ও বন্যপ্রাণী বিচলিত হয়ে স্থান পরিবর্তন করে। পাশাপাশি পর্যটকদের উচ্চ শব্দ, হৈ-হুল্লোড় ও গান-বাজনাও বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক পরিবেশে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে সরেজমিনে বনের ভেতরে বড় ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য বা ময়লা চোখে পড়েনি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রশাসনের নির্ধারিত ব্যবস্থায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার করছেন। গাছ কাটার অভিযোগও মাঠপর্যায়ে পাওয়া যায়নি। বর্ষাকালে বনের পানিও মোটামুটি স্বচ্ছ দেখা গেছে।

রাতারগুলে হিজল, করচ, বরুণ, পিঠালি, অর্জুন, ছাতিম, গুটিজাম ও বটসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। জলাবনের পরিবেশে সাপ, বানর, গুইসাপসহ নানা প্রাণীর পাশাপাশি সাদা বক, কানা বক, মাছরাঙা ও টিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মেলে।

সরেজমিনে সাদা বক, কানা বক ও মাছরাঙা দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সংরক্ষিত এলাকায় বাঁধ বা প্রতিবন্ধকতা না থাকায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও সরীসৃপ পার্শ্ববর্তী গোয়াইন নদী ও হাওর এলাকায়ও চলাচল করতে পারে।

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে গত পাঁচ বছরে রাতারগুলে দৃশ্যমান বড় কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়নের তথ্য পাওয়া যায়নি। বন বিভাগের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা রক্ষার কার্যক্রমের বাইরে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন খুব একটা চোখে পড়েনি।

বর্তমানে বন বিভাগে একজন বিট কর্মকর্তা ও চারজন বনপ্রহরী দায়িত্ব পালন করছেন। সরেজমিনে দু-একজন বনকর্মীকে টহল দিতে দেখা গেছে। তবে এত বড় বনাঞ্চল ও বিপুলসংখ্যক পর্যটকের চাপ সামলাতে এই জনবল যথেষ্ট কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

রাতারগুলে পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশ ফি আদায় করা হলেও দৈনিক বা বার্ষিক রাজস্বের সুনির্দিষ্ট তথ্য এ প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। আদায়কৃত অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হয়, সে বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত হিসাব পাওয়া যায়নি।

কর্তৃপক্ষের দাবি, আগের তুলনায় পর্যটন থেকে আয় কমেছে। তবে পর্যটকের প্রকৃত সংখ্যা, টিকিট বিক্রি ও রাজস্বের সমন্বিত হিসাব প্রকাশ না থাকায় এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাতারগুলে প্রবেশপথের ২ ও ৩ নম্বর ঘাটের সড়কের বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ রয়েছে। কোথাও কোথাও সড়ক সরু। পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পর্যটকবাহী গাড়ির দীর্ঘ যানজট দেখা গেছে।

স্থানীয় দোকানি ও চা-পান বিক্রেতা আহমেদ বলেন, পর্যটকের উপস্থিতি থাকলে তাদের বেচাকেনা ভালো হয়। মাঝি রেজওয়ান আহমেদ জানান, বিশেষ দিন ও সাপ্তাহিক ছুটিতে আয় ভালো হলেও অন্য দিনগুলোতে আয় তুলনামূলক কম।

শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সরেজমিন পরিদর্শনে টুরিস্ট পুলিশের পোশাক পরা কাউকে পাওয়া যায়নি। দূরে একজন পুলিশ সদস্যকে দেখা গেলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

রাতারগুল টুরিস্ট জোনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সাইনবোর্ডে হেল্পলাইন নম্বর দেওয়া রয়েছে। তবে এ প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করে কয়েকটি সরকারি নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে পর্যটকদের জন্য এসব নম্বর কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, লাইফ জ্যাকেট ও নির্ধারিত নৌকা ভাড়ার বিষয়ে অভিযোগ পর্যালোচনা করা হবে। যানজট ও পার্কিং সমস্যার বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সারী রেঞ্জের বন কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বলেন, রাতারগুলসহ বনের পতিত জমিতে নতুন পরিকল্পনার কিছু উদ্যোগ নেওয়া হবে। বনপ্রহরী ও বিট কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচলের ক্ষেত্রে বন বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সীমিত। তবে ইঞ্জিনের শব্দে জলজ প্রাণী ও বন্যপ্রাণী বিচলিত হওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।

তিনি আরও জানান, ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পুরোনো ওয়াচ টাওয়ারটি পর্যটকদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। নতুন একটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবাদীদের দীর্ঘদিনের দাবি, রাতারগুলের ৫০৪ একর সংরক্ষিত বনকে আরও কার্যকরভাবে রক্ষায় প্রয়োজনীয় পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা। পর্যটনের নামে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, অনিয়ন্ত্রিত নৌযান, শব্দদূষণ এবং অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ যাতে জলাবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনার দাবি রয়েছে।

রাতারগুলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখনো পর্যটকদের মুগ্ধ করে। নৌকায় বসে মাঝিদের গান শুনতে শুনতে জলাবনের ভেতর ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্যও পর্যটকদের আনন্দ দেয়। কিন্তু এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে পর্যটন ব্যবস্থাপনা কতটা প্রস্তুত—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

একদিকে বাড়ছে পর্যটক, নৌকা ও পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতি; অন্যদিকে এখনো নির্ধারিত হয়নি পর্যটকের ধারণক্ষমতা, নৌযানে লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহারও নিশ্চিত নয়, নেই পর্যাপ্ত জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, আর একমাত্র ওয়াচ টাওয়ারটি দীর্ঘদিন বন্ধ। ফলে রাতারগুলের সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটন সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা জোরদার করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: