বাংলাদেশের সংসদে সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া তিনটি আইন মানবাধিকার সুরক্ষার বিদ্যমান কাঠামো দুর্বল করেছে এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে বর্তমান সরকার সরে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির দাবি, নতুন আইনগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া কয়েকটি সংস্কারমূলক উদ্যোগকে সীমিত করেছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ জানায়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) ও গুম প্রতিরোধ-প্রতিকার এবং র্যাবের পরিবর্তে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) সংক্রান্ত নতুন আইনগুলোর মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহির ক্ষেত্রে আগের কিছু সুরক্ষা কমানো হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকার এনএইচআরসিকে শক্তিশালী করতে এবং গুমের ঘটনা প্রতিরোধ ও তদন্তের জন্য দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু নতুন সরকার ওই কাঠামোর পরিবর্তে যে আইন করেছে, তাতে কমিশনের স্বাধীনতা ও তদন্তের ক্ষমতা আগের তুলনায় সীমিত হয়েছে বলে দাবি সংস্থাটির।
এইচআরডব্লিউ বলছে, ৬ সেপ্টেম্বর পাস হওয়া নতুন আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা এনএইচআরসিকে দেওয়া হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনের সদস্য নিয়োগ, বাজেট ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
সংস্থাটির মতে, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনেও আগের অধ্যাদেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আটককেন্দ্র পরিদর্শন ও গুমের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতার বিষয়টি রয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হওয়া স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইনের মাধ্যমে র্যাবকে এসআরবিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এইচআরডব্লিউর দাবি, নতুন আইনে বাহিনীটির জনবল, ক্ষমতা ও সম্পদ নতুন কাঠামোয় স্থানান্তর করা হলেও পর্যাপ্ত সুরক্ষা, প্রশিক্ষণ, তদারকি ও জবাবদিহির বিধান স্পষ্ট নয়।
এইচআরডব্লিউ বলছে, র্যাবের নাম পরিবর্তন করলেও বাহিনীটির কাঠামোর বড় অংশ বহাল রয়েছে। সংস্থাটি এর আগে র্যাব বিলুপ্তিরও আহ্বান জানিয়েছিল।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলেন, অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে প্রকৃত সংস্কার এবং অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে নজরদারি ও জবাবদিহি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতে গুম ও হত্যার মতো গুরুতর লঙ্ঘন প্রতিরোধের বিষয়ে আস্থা তৈরি করে না।
এইচআরডব্লিউর দাবি, বর্তমান সরকারের আমলে হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা আগের তুলনায় কমলেও রাজনৈতিক বিরোধীদের আটক নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আগস্টেও সংস্থাটি দীর্ঘমেয়াদি বিচারপূর্ব আটক নিয়ে সরকারের প্রতি উদ্বেগ জানিয়েছিল।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নতুন সরকারের মানবাধিকার নীতি ও রেকর্ড নিয়ে উদ্বেগ জানাতে আহ্বান জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। পাশাপাশি এসআরবির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।
এইচআরডব্লিউর বক্তব্য, নতুন সরকারের সংস্কারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাম্প্রতিক আইনগুলোর কিছু পরিবর্তনের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, মানবাধিকার সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইনগুলোতে আরও শক্তিশালী স্বাধীনতা ও নজরদারির ব্যবস্থা প্রয়োজন।