বর্ষাকাল শেষের পথে। অথচ বৃষ্টির দেখা নেই জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার অনেক এলাকায়। দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় আমনক্ষেতের মাটি শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পানির অভাবে রোপণ করা ধানের চারা নুয়ে পড়েছে। ফলে ফসল বাঁচাতে বাধ্য হয়ে সেচের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষকদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন বাড়তি উৎপাদন খরচ। বৃষ্টিনির্ভর আমন চাষে যেখানে সেচের প্রয়োজন তুলনামূলক কম থাকার কথা, সেখানে অনাবৃষ্টির কারণে একের পর এক সেচ দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং এবং চুরি ঠেকাতে গভীর নলকূপের ট্রান্সফরমার খুলে রাখার সমস্যা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আমনক্ষেতের মাটির উপরিভাগ শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। অনেক জমিতে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। পানির অভাবে কিছু জমির ধানের চারা শুকিয়ে নুয়ে পড়েছে। কৃষকরা কেউ সেচ দিচ্ছেন, আবার কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষায় রয়েছেন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কালাই উপজেলায় প্রায় ১১ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এসব জমিতে সেচের জন্য রয়েছে ৪৯৬টি গভীর নলকূপ ও ২৮৭টি অগভীর নলকূপ। বৃষ্টির ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দুর্গাপুর গ্রামের কৃষক জয়নুল হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টি না থাকায় সেচ দিয়ে ধান বাঁচাতে হচ্ছে। কিন্তু সেচ দেওয়ার সময় বিদ্যুৎ না থাকলে বড় সমস্যায় পড়তে হয়। আমনের বাজারদরও ভালো নয়। কয়েক দফা সেচ দিতে হলে এবার ধান চাষে লাভ করা কঠিন হয়ে যাবে।’
জমিনপুর গ্রামের কৃষক এমদাদুল হক বলেন, ‘ভাদ্র মাসে ধানের গোছা বাড়ানোর সময়। এ সময় জমিতে পর্যাপ্ত পানি থাকার কথা। কিন্তু এখন জমি ফেটে গেছে। সেচ দিতে হলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। ধানের দাম না বাড়লে শেষ পর্যন্ত লোকসান গুনতে হবে কৃষককেই।’
অন্যদিকে গভীর নলকূপের মালিকদেরও রয়েছে আলাদা সংকট। চুরির আশঙ্কায় অনেকে নলকূপের ট্রান্সফরমার খুলে নিরাপদ স্থানে রেখে দিয়েছেন। ফলে প্রয়োজনের সময় সেচ দিতে গিয়ে ট্রান্সফরমার আবার স্থাপন করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে বাড়তি খরচ ও ভোগান্তি।
গভীর নলকূপের মালিক আব্দুস ছালাম বলেন, ‘চুরির ভয়ে ট্রান্সফরমার নামিয়ে রেখেছি। এখন বৃষ্টি নেই, সেচের প্রয়োজন। কিন্তু বারবার ট্রান্সফরমার ওঠানো-নামানোর খরচ বহন করা কঠিন। তার ওপর লোডশেডিং থাকায় ট্রান্সফরমার তুলেও লোকসানের আশঙ্কা থাকে।’
কৃষকদের ভাষ্য, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে কখন সেচ দিতে হবে আর কখন বৃষ্টির আশায় অপেক্ষা করতে হবে—তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শিমুল হোসেন বলেন, আমন ধানের শুরুর দিকে জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন বৃষ্টির ঘাটতি থাকলে ধানের চারা দুর্বল হয়ে ফলনে প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়ার পাশাপাশি পানির অপচয় রোধ এবং জমির আর্দ্রতা ধরে রাখার বিষয়ে কৃষকদের সচেতন হতে হবে।
বৃষ্টির ঘাটতি আর বাড়তি সেচ খরচ—দুইয়ের চাপে এখন আমন নিয়ে শঙ্কায় কালাইয়ের কৃষকরা। সময়মতো বৃষ্টি না হলে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।