ডিয়েগো ম্যারাডোনার ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটি ছিল একই সঙ্গে বিস্ময়, বিতর্ক এবং ট্র্যাজেডির এক অনন্য অধ্যায়। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে মাত্র দুটি ম্যাচে মাঠে নেমেই ইতিহাসের পাতা থেকে কার্যত ছিটকে পড়েন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
বিশ্বকাপে তার মাঠে থাকার সময় ছিল মোটে ১৭৩ মিনিট। কিন্তু এই অল্প সময়ের উপস্থিতির আগের প্রস্তুতি এবং পরের ঘটনাপ্রবাহই ফুটবল ইতিহাসে তৈরি করে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি।
নিষেধাজ্ঞা ও প্রত্যাবর্তনের নাটক
১৯৯১ সালে ইতালির সিরি-আ লিগে কোকেন গ্রহণের অভিযোগে ধরা পড়ার পর ম্যারাডোনাকে ফিফা ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করে। এরপর দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, বিতর্ক আর ফর্ম হারানোর গল্প পেরিয়ে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আবারও জাতীয় দলে ফেরেন তিনি।
আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ প্লে-অফে নেতৃত্ব দেন তিনি, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কঠিন লড়াই শেষে দলটি বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়। সেই সময়েই ভক্তদের আশা ছিল—ম্যারাডোনার হাত ধরেই আবারও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখবে আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপে ঝলক দেখিয়ে বিদায়
যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের শুরুটা ছিল দারুণ। গ্রিসের বিপক্ষে ম্যাচে ম্যারাডোনা করেন এক অসাধারণ গোল, যা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকে। পুরো ম্যাচেই তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার খেলার নিয়ন্ত্রক।
কিন্তু এই উজ্জ্বলতার মাঝেই আসে অপ্রত্যাশিত ধাক্কা। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর ডোপ টেস্টে ধরা পড়ে নিষিদ্ধ পদার্থ ‘এফেড্রিন’। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ফিফা তাকে টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কার করে।
নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়া
নিষেধাজ্ঞার পর ম্যারাডোনা ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলেন, ‘ওরা আমার পা কেটে ফেলেছে।’ তার দাবি ছিল, একটি এনার্জি ড্রিংকের কারণে অজান্তেই নিষিদ্ধ পদার্থ শরীরে প্রবেশ করেছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে ফিফা ও আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনেও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। অনেকে মনে করেন, ম্যারাডোনাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপের ব্যবসায়িক স্বার্থকেও প্রভাবিত করেছিল।
একটি যুগের সমাপ্তি
বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের মধ্য দিয়েই কার্যত শেষ হয়ে যায় ম্যারাডোনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। পরবর্তীতে তিনি ক্লাব ফুটবলে কিছু সময় খেললেও জাতীয় দলের জার্সিতে আর কখনও দেখা যায়নি এই কিংবদন্তিকে।
ফুটবল ইতিহাসে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ তাই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়—এটি ম্যারাডোনার মহাকাব্যের শেষ, যেখানে গৌরবের চেয়ে বেশি জায়গা দখল করে নেয় বিতর্ক আর অপূর্ণতার বেদনা।