সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে সরকারি সেবার মানোন্নয়ন এবং জন-প্রত্যাশা পূরণে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেন, জনগণ যেন সহজে, দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে সেবা পায়, তা নিশ্চিত করা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত সাধারণ মানুষের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) নগরীর পিটিআই সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘গ্রাম আদালত কার্যক্রমের অগ্রগতি ও করণীয়’ শীর্ষক জেলা পর্যায়ের অর্ধবার্ষিক সমন্বয় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে বাস্তবায়নাধীন ‘বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (তৃতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এ সভার আয়োজন করে।
জেলা প্রশাসক বলেন, আমরা বছরের পর বছর সভা-সেমিনারে অংশ নিই, নানা পরিকল্পনা ও পরিসংখ্যান উপস্থাপন করি। কিন্তু নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে— বাস্তবে আমরা কতটুকু পরিবর্তন আনতে পেরেছি? জনগণ কি আমাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে?
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি সমাজ ও দেশের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তাকে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা প্রায়ই অন্যের ভুল খুঁজি, কিন্তু নিজের দায়িত্ব কতটুকু পালন করছি, তা নিয়ে আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি কমে গেছে। অথচ দেশ ও সমাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব আমাদেরই ওপর ন্যস্ত।
সাপ্তাহিক গণশুনানির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ডিসি বলেন, প্রতি বুধবার গণশুনানিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আসেন। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, অনেক সমস্যাই স্থানীয় পর্যায়ে সমাধান করা সম্ভব ছিল। আমরা যদি নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে আরও আন্তরিক হতাম, তবে মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমে যেত।
দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, বর্তমানে উচ্চ ও নিম্ন আদালত মিলিয়ে দেশে প্রায় ৫০ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। স্থানীয় পর্যায়ে ছোটখাটো বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে আদালতের ওপর চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত একটি কার্যকর উদ্যোগ।
তিনি বলেন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে স্বল্প ব্যয়ে ও দ্রুত বিচারসেবা দিতে গ্রাম আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জনবল বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনার কর্মস্থলকে সেবার সুবাসে ও মানবিকতার সৌরভে ভরিয়ে তুলুন, যেন মানুষ আপনাকে আস্থার প্রতীক হিসেবে মনে রাখে।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (উপসচিব) গোলাম মোহাম্মদ মইনুদ্দিন গ্রাম আদালত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গ্রাম আদালতের সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেবামুখী মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে এ সেবা সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
সভায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম আদালত কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। যেসব ইউনিয়নে মামলার সংখ্যা শূন্য বা তুলনামূলক কম, বিশেষ করে মিরসরাই উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের উদাহরণ তুলে ধরে সেখানে জনসচেতনতা ও আস্থা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মামলার নথি, রেজিস্টার ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সঠিকভাবে সংরক্ষণের তাগিদ দেওয়া হয়। তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সভা শেষ হয়।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন প্রকল্প বাস্তবায়ন সহযোগী সংস্থা ‘ইপসা’র পরিচালক (সামাজিক উন্নয়ন) নাছিম বানু শ্যামলী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের চট্টগ্রাম জেলা ব্যবস্থাপক সাজেদুল ইসলাম আনোয়ার ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং ১৯১টি ইউনিয়নের ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।