জাল নোট, টানা পার্টি ও ডিজিটাল ফাঁদ আতঙ্ক

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশে কোরবানির পশুর হাট প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আর কয়েক

2026-05-15T12:27:50+00:00
2026-05-15T12:50:47+00:00
  মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৭ আশ্বিন ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
কোরবানির হাট ঘিরে প্রতারণার ছক
জাল নোট, টানা পার্টি ও ডিজিটাল ফাঁদ আতঙ্ক
শাকিল আহমেদ
শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১২:২৭ পিএম  আপডেট: ১৫.০৫.২০২৬ ১২:৫০ পিএম
ফাইল ছবি
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশে কোরবানির পশুর হাট প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই জমে উঠবে বছরের সবচেয়ে বড় অস্থায়ী মৌসুমি বাণিজ্য। গরু-ছাগলের হাঁকডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম আর হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেনে সরগরম হয়ে উঠবে দেশের হাটগুলো। 

তবে উৎসবের এই আমেজের আড়ালেই বাড়ছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। ইতোমধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল নোট কারবারি, টানা পার্টি, অজ্ঞান পার্টি ও ডিজিটাল প্রতারক চক্র। ফলে কোরবানির পশুর হাটকে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ ও শঙ্কা।

প্রতি বছর ঈদুল আজহার আগে দেশের পশুর হাটগুলোতে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের লেনদেন হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রগুলোও মাঠে নামে নতুন নতুন কৌশলে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর বড় হাটগুলোকে কেন্দ্র করে জাল নোট সিন্ডিকেটগুলো ইতোমধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে হাটে প্রবেশ করে এবং সুযোগ বুঝে ব্যবসায়ী কিংবা ক্রেতার হাতে জাল টাকা ধরিয়ে দেয়। 

হাট সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দিনের বেলায় অতিরিক্ত ভিড় এবং রাতের বেলায় ক্লান্তির সুযোগ নেয় এসব চক্র। অনেক সময় একজন দামাদামিতে ব্যস্ত রাখে, আরেকজন টাকা গোনার সময় আসল নোটের সঙ্গে জাল নোট মিশিয়ে দেয়। 

আবার কখনো পুরো টাকার বান্ডিল বদলে ফেলার ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে হাজার ও পাঁচশ টাকার নোটে বড় অঙ্কের লেনদেন হওয়ায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।    

শুধু জাল নোট নয়, টানা পার্টি ও অজ্ঞান পার্টির সদস্যরাও ঈদকে সামনে রেখে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। ভিড়ের মধ্যে কৌশলে টাকা, মোবাইল ফোন কিংবা ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা প্রায় প্রতি বছরই ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে ব্যবসায়ী বা ক্রেতাকে অচেতন করার অভিযোগও পাওয়া যায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, ঈদের আগে পশুর হাটগুলোকে ঘিরে রাজধানীতে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের আনাগোনা বেড়ে যায়। আর এজন্য আগ থেকেই ঢাকার গাবতলী, মেরুল বাড্ডা, বছিলা, সারুলিয়া, উত্তরা ও খিলক্ষেত এলাকার হাটগুলোতে অতিরিক্ত নজরদারির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার বলেন, পশুর হাটগুলোতে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি বাড়ানো হবে সিসিটিভি নজরদারি, চেকপোস্ট ও ভ্রাম্যমাণ টহল। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের চলাফেরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। 

তিনি আরও বলেন, শুধু হাটের ভেতর নয়, আশপাশের সড়ক, বাসস্ট্যান্ড, অস্থায়ী আবাসিক এলাকা ও পার্কিং স্পটগুলোতেও বাড়তি নজরদারি রাখা হবে। কারণ প্রতারক চক্রগুলো সাধারণত হাটের বাইরের এলাকাগুলোকে বেশি টার্গেট করে। এদিকে নগদ লেনদেনের পাশাপাশি এখন নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্রতারণা। মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন পেমেন্ট জনপ্রিয় হওয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণাও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা ভুয়া স্ক্রিনশট দেখিয়ে বা ভুয়া এসএমএস পাঠিয়ে টাকা পাঠানোর অভিনয় করে পশু নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক ব্যবসায়ী এখনো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রযুক্তিগত বিষয় সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নন। ফলে টাকা সত্যিই অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে কিনা যাচাই না করেই পশু হস্তান্তর করে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, শুধুমাত্র এসএমএস দেখে নয়, নিজ অ্যাকাউন্টে টাকা জমা নিশ্চিত হওয়ার পরই পশু বুঝিয়ে দেওয়া উচিত।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাল নোট প্রতিরোধে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় দেশের অনুমোদিত পশুর হাটগুলোতে ‘জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ’ স্থাপন করা হচ্ছে। এসব বুথে অভিজ্ঞ ব্যাংক কর্মকর্তারা বিনামূল্যে নোট যাচাই ও গণনার সেবা দেবেন। পাশাপাশি থাকবে জাল নোট শনাক্তকারী বিশেষ মেশিন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট সূত্র জানিয়েছে, শুধু রাজধানী নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাটেও এ সেবা চালু থাকবে। যেসব এলাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অফিস নেই, সেখানে সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। 

রাজধানীর গাবতলী, মেরুল বাড্ডা, সারুলিয়া, বছিলা, খিলক্ষেত ও উত্তরাসহ বড় কয়েকটি পশুর হাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংকও নির্ধারণ করা হয়েছে। গাবতলী হাটে ইসলামী ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক যৌথভাবে বুথ পরিচালনা করবে। 

এ ছাড়া বিভিন্ন হাটে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়াসহ একাধিক ব্যাংক বুথ পরিচালনা করবে। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু জাল নোট শনাক্ত নয়, বড় অঙ্কের টাকা দ্রুত ও নিরাপদে গণনার সুবিধাও থাকবে এসব বুথে। ফলে ব্যবসায়ীরা সহজেই লেনদেন যাচাই করতে পারবেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংক শাখায় নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য নিয়ে সচেতনতামূলক ভিডিও প্রদর্শনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাধারণ মানুষকে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। 

এর মধ্যে- নোট হাতে পাওয়ার পর অবশ্যই ওয়াটারমার্ক, নিরাপত্তা সুতা, রঙ পরিবর্তনকারী অংশ ও উঁচু ছাপ পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ভিড়ের মধ্যে টাকা লেনদেন না করা, অপরিচিত ব্যক্তির সহায়তা না নেওয়া এবং সম্ভব হলে ব্যাংক বুথ ব্যবহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ব্যবসায়ী দূর-দূরান্ত থেকে পশু নিয়ে হাটে আসেন। দীর্ঘ ভ্রমণ, রাতজাগা ও অতিরিক্ত শারীরিক চাপের কারণে তারা সহজেই প্রতারণার শিকার হন। বিশেষ করে যারা প্রথমবার ব্যবসা করতে আসেন, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।

এদিকে ঈদ সামনে রেখে জাল নোট তৈরি ও সরবরাহকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে বিভিন্ন প্রিন্টিং প্রেস ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের। 

রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় ইতোমধ্যে কয়েকটি চক্র শনাক্ত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কোনো বুথে জাল নোট শনাক্ত হলে ২০০৭ সালের জাল নোটবিষয়ক নীতিমালা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটকও করা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জনসচেতনতা। কারণ প্রতারক চক্রগুলো প্রতিনিয়ত কৌশল বদলাচ্ছে। তাই নগদ কিংবা ডিজিটাল, উভয় ধরনের লেনদেনেই বাড়তি সতর্কতা জরুরি। সংশ্লিষ্ট মহলের ভাষ্য, কোরবানির পশুর হাট দেশের অন্যতম বড় মৌসুমি অর্থনৈতিক কার্যক্রম। কয়েক সপ্তাহের এই বাণিজ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। ফলে এই বাজার নিরাপদ রাখা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

এদিকে সূত্র জানিয়েছে, এবার রাজধানীতে ২৭টিসহ সারাদেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাটে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার কাজ শুরু হয়েছে। 

জানা গেছে, ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টিসহ মোট ২৭টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। অনেক হাট এলাকায় ইতোমধ্যে বাঁশ, শামিয়ানা, ছাউনি ও মাইক স্থাপনের কাজ শেষ পর্যায়ে। পাশাপাশি প্রস্তুত করা হচ্ছে হাসিল ঘর, পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা। 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন করা হবে। 

এছাড়া প্রতিটি হাটে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবার জন্য ভেটেরিনারি মেডিকেল টিমও থাকবে। 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। সে হিসেবে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। ফলে পশু সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, এবার যত্রতত্র বা সড়কের ওপর কোনো পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না। নিয়মের বাইরে কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি। ক্রেতারা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে পশু কিনতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য প্রতিটি হাটে বিশেষ ব্যবস্থাপনা রাখা হয়েছে। হাট ব্যবস্থাপনার জন্য যা যা প্রয়োজন সবকিছু প্রস্তুত করা হয়েছে। দুই সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, এবার পাঁচ দিনব্যাপী পশুর হাটে কেনাবেচা চলবে। 

অন্যদিকে সীমান্ত এলাকায় পশুর হাট বসানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সপ্তাহ থেকেই দেশের বিভিন্ন হাটে কোরবানির পশু আসা শুরু হবে এবং শেষ মুহূর্তে জমে উঠবে ঈদুল আজহার সবচেয়ে বড় এই মৌসুমি বাণিজ্য। 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: