আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। বাঙালি জাতির হাজার বছরের সংগ্রাম-সাধনার চূড়ান্ত অর্জনের সূচনা দিন। ২০২৬ সালে উদযাপিত হচ্ছে স্বাধীনতার ৫৬তম বার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিনেই শুরু হয়েছিল বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, যার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়-এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা চালায়। ঢাকাসহ সারাদেশে নির্বিচারে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। এই নির্মমতার বিরুদ্ধে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি ও প্রধান রাজনৈতিক নেতা। তাঁর অনুপস্থিতিতে গঠিত মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে সংগঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। এ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জিয়াউর রহমান, যিনি চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অসীম ত্যাগ ও আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ culminates করে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবস-যেদিন পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশ অর্জন করে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ সংঘটিত করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র অনুযায়ী প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন এবং প্রায় ২ লক্ষাধিক নারী নির্যাতনের শিকার হন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, যেখানে পরিকল্পিতভাবে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে একটি জাতিকে মেধাশূন্য করার অপচেষ্টা চালানো হয়।
এই সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করে দেশীয় দোসর-রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী। তারা নিরীহ বাঙালির বিরুদ্ধে হত্যা, লুণ্ঠন ও নির্যাতনে সক্রিয় অংশ নেয়। ইতিহাসে তাদের ভূমিকা বিশ্বাসঘাতকতার এক জঘন্য উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ চারটি খেতাব প্রদান করা হয়-বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীক। সর্বোচ্চ খেতাব বীরশ্রেষ্ঠ লাভ করেন সাতজন বীর সেনানী-মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, মতিুর রহমান, নূর মোহাম্মদ শেখ, রুহুল আমিন, হামিদুর রহমান এবং মুন্সী আব্দুর রউফ। তাঁদের বীরত্বগাঁথা আজও প্রজন্মকে সাহস ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দেয়।
মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান ছিল অসামান্য ও অনন্য। নির্যাতিত নারীরা ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে স্বীকৃতি পান। পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসহ সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস-ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন বাঙালির স্বাধীনতার ভিত মজবুত করে।
তবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু দেশের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তা ব্যাপক সাড়া জাগায়। বিদেশি সাংবাদিক, গণমাধ্যম ও বিশ্বজনমত বাংলাদেশের পক্ষে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাইমন ড্রিং, যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বাস্তব চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। তাঁর প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিশ্ব প্রথমবারের মতো ঢাকার বিভীষিকা সম্পর্কে অবগত হয়।
একইভাবে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর ঐতিহাসিক “Genocide” প্রতিবেদন প্রকাশ করে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন। এই প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। এছাড়া সিডনি শনবার্গ এবং পিটার হ্যাজেলহার্স্ট-এর মতো সাংবাদিকরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যুদ্ধের বাস্তবতা তুলে ধরেন।
মার্কিন কূটনীতিক আর্চার কে. ব্লাড তাঁর ঐতিহাসিক “Blood Telegram”-এর মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান, যা বিশ্ব কূটনৈতিক ইতিহাসে এক সাহসী দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ, যা আয়োজন করেন জর্জ হ্যারিসন ও রবিশঙ্কর। এই কনসার্ট বাংলাদেশের পক্ষে বৈশ্বিক সহমর্মিতা সৃষ্টি করে এবং শরণার্থীদের সহায়তায় তহবিল সংগ্রহ করে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তোলা ছবি, ভিডিও ও সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হলে বিশ্ব বিবেক নাড়া খায়। বিশেষ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর মানবিক বিপর্যয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করেন এবং শেষ পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়।
স্বাধীনতার পরপরই ভারত ও ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যান্য দেশও স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে তাই শুধু দেশের বীর শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিই নয়, সেইসব বিদেশি সাংবাদিক, কূটনীতিক ও মানবতাবাদী মানুষদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়, যারা সত্যকে তুলে ধরে একটি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রামকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করেছিলেন।
স্বাধীনতা শুধু একটি ভূখণ্ড নয়-এটি একটি চেতনা, একটি দায়িত্ব। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে হলে ইতিহাস জানতে হবে, নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে এবং দেশ গঠনে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখতে হবে।
লাল-সবুজের পতাকায় গর্বিত এই বাংলাদেশ চিরকাল অম্লান থাকুক-এই হোক মহান স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার।
লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক