দারিদ্র্য পেরিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে—আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জীবনপথ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী নাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৩৯ সালের ১৯শে এপ্রিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পবিত্র শহর মাশহাদের এক

2026-03-02T16:32:49+00:00
2026-03-02T16:35:43+00:00
  বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
দারিদ্র্য পেরিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে—আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জীবনপথ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ৪:৩২ পিএম  আপডেট: ০২.০৩.২০২৬ ৪:৩৫ পিএম
ইরানের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী নাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৩৯ সালের ১৯শে এপ্রিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পবিত্র শহর মাশহাদের এক রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবারে তাঁর জন্ম। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তাঁর নিহতের খবর বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। তবে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর এই পথটি তাঁর জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। দারিদ্র্য, শারীরিক সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইরানের অপ্রতিরোধ্য 'সুপ্রিম লিডার'।

অভাবের শৈশব ও মায়ের প্রভাব;
আট ভাই-বোনের মধ্যে খামেনি ছিলেন দ্বিতীয়। বাবা সৈয়দ জওয়াদ খামেনি ছিলেন একজন শিয়া পণ্ডিত। তবে বাবার পাণ্ডিত্য থাকলেও সংসারে ছিল চরম অভাব। খামেনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, বহু রাত তাঁদের পুরো পরিবারকে অর্ধেক পেটে বা ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে হতো। ছেঁড়া ও পুরোনো পোশাক পরে মাদ্রাসায় যাওয়ায় সহপাঠীদের উপহাসের শিকারও হতে হয়েছে তাঁকে। শৈশবে তাঁর একজোড়া ‘ফিতাওয়ালা জুতা’র শখ থাকলেও তা অপূর্ণই থেকে গিয়েছিল দীর্ঘকাল।

তবে দারিদ্র্যের মাঝেও খামেনির বড় আশ্রয় ছিলেন তাঁর মা খাদিজে মির্দামাদী। মায়ের চমৎকার কুরআন তেলাওয়াত এবং নৈতিক শিক্ষা খামেনির জীবনদর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

‘অলস ছাত্র’ থেকে মেধার বিচ্ছুরণ;
খামেনির শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল এক ভয়ংকর মক্তব শিক্ষকের শাসনের মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি যখন স্কুলে ভর্তি হন, তখন এক অদ্ভুত সংকটে পড়েন। তাঁর দৃষ্টিশক্তি ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ, যা দীর্ঘ সময় কেউ বুঝতে পারেনি। ব্ল্যাকবোর্ড দেখতে না পারায় শিক্ষকরা তাঁকে ‘বোকা ও অলস’ হিসেবে গণ্য করতেন। তবে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় চশমা ব্যবহারের পর তাঁর সুপ্ত প্রতিভা প্রকাশ পায় এবং তিনি ক্লাসের অন্যতম সেরা ছাত্রে পরিণত হন।

সাহিত্যপ্রেম ও ধর্মীয় শিক্ষা;
পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি বাবার অনীহা থাকায় খামেনিকে উচ্চ বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে কোমে পাঠানো হয় ধর্মীয় শিক্ষার জন্য। সেখানে থাকাকালীন খামেনির মধ্যে সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। তিনি ‘আমিন’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। অবাক করার মতো তথ্য হলো, কোমে ধর্মীয় উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার আগেই তিনি ভিক্টর হুগো, লিও টলস্টয় ও রোমা রোলার মতো বিখ্যাত লেখকদের প্রায় এক হাজারেরও বেশি উপন্যাস পড়ে শেষ করেছিলেন।

খোমেনির সান্নিধ্য ও রাজনৈতিক উত্থান;
১৯৫৫ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ খামেনির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি খোমেনির একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন এবং তৎকালীন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ ও নির্বাসনের শিকার হতে হয়।

বিপ্লব পরবর্তী অধ্যায় ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত হাত;
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর খামেনি তেহরানে ফিরে আসেন এবং নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে একটি মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন, যার ফলে তাঁর ডান হাতটি চিরতরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। এর ঠিক দুই মাস পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-আলী রাজাই নিহত হলে খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। টানা আট বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।

সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে অভিষেক;
১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর এক নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে খামেনি ইরানের 'সর্বোচ্চ নেতা' নির্বাচিত হন। যদিও তখন তাঁর পদমর্যাদা ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ ছিল না, কিন্তু সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তাঁকে এই পদে আসীন করা হয়। এরপর টানা তিন দশকেরও বেশি সময় তিনি ইরানের একক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামলে ছয়জন প্রেসিডেন্ট এলেও দেশের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল তাঁর হাতেই।

এক যুগের অবসান;
মাশহাদের সেই ক্ষুধার্ত শিশুটি যে একদিন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবেন, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরানের দীর্ঘ এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো। তাঁর এই প্রস্থান শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, বরং পুরো বিশ্ব রাজনীতিতেই এক বিশাল শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: