শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, নদীদূষণ ও বর্জ্যদূষণে বিপর্যস্ত রাজধানী ঢাকা। নগর জীবনের সবখানে এসব দূষণ বিরাজ করছে। এ চার দূষণের কবলে পড়ে ভোগান্তির পাশাপাশি নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নগরবাসী। বিশেষ করে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে বেশি ক্ষতিগ্রহস্ত হচ্ছেন এখানকার বাসিন্দারা। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার থেকে বাংলাদেশ সচিবালয় ও এর আশপাশের এলাকায় হর্ন বাজানোর বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২৫-এর আওতায় এই কার্যক্রম চলছে। কিন্তু অন্যান্য দূষণ প্রতিরোধে সরকারের আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় দিন দিন দূষণের মাত্রা বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে শব্দদূষণ ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় তা রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। এ নিয়ে ইতোমধ্যে নতুন নির্দেশনায় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সচিবালয় সংলগ্ন এলাকাগুলোকে ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে এসব এলাকায় হর্ন বাজালে বড় অঙ্কের জরিমানা ও জেল খাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর ফলে সামনের দিনে শব্দদূষণ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, রাজধানীর যানজটের কারণে আর্থিক ক্ষতি এবং সময় অপচয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শব্দ ও বায়ু দূষণ। উচ্চশব্দের কারণে বিপুল সংখ্যক শিশুর শ্রবণশক্তি হ্রাস পাচ্ছে, এমনকি অনেক শিশু বধির ও বিকলাঙ্গ হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে আরো নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা। তাছাড়া, শব্দ দূষণের কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে মনোসংযোগের মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। আইন অনুযায়ী নীরব এলাকায় দিনে ৪৫ ডেসিবল (শব্দ পরিমাপের একক) ও রাতে ৩৫ ডেসিবল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫০, রাতে ৪০, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০, রাতে ৫০, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০, রাতে ৬০ এবং শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডিসিবলের মধ্যে শব্দের মাত্রা রাখা বাঞ্ছনীয়। নির্ধারিত এই শব্দ সীমার চেয়ে বেশি শব্দ উৎপাদনকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেও নেই তার প্রয়োগ। আর যানবাহনের বিষাক্ত কার্বন ক্ষয় করছে ওজোন স্তর। সেই সঙ্গে নগরবাসী আক্রান্ত হচ্ছে হাঁপানি, অনিদ্রা, শ্রবণ শক্তি হ্রাস, মনসংযোগ কমে যাওয়া, মাথাব্যথা, খিটখিটে মেজাজ ও যক্ষ্মাসহ নানা ধরনের রোগে। এর মধ্যেই বসবাস করছে দুই কোটির বেশি মানুষ। এমতাবস্থায় শব্দদূষণ রোধে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নির্দেশনায় বিশেষ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা শুরু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্ধারিত ‘নীরব এলাকায়’ কেউ হর্ন বাজালে তাকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা তিন মাসের কারাদন্ড, কিংবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হতে পারে। সচিবালয়ের চারদিকের রাস্তা ও অভ্যন্তরীণ পার্কিং এলাকায় এই নিয়ম কঠোরভাবে মানার জন্য সব সরকারি ও বেসরকারি গাড়ি চালকদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। মূলত শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে এনে জনস্বাস্থ্য ও শান্তি বজায় রাখতেই এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, নদীদুষণ ও বর্জ্যদূষণ নিয়ন্ত্রণে ২০০৬ সালে বিধিমালা পাস হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ না থাকায় নগরীতে এসব দূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছেই। তারপরও এসব রোধ করতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ সরকারের সংশিষ্ট মহলগুলো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নগরবাসী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের এক গবেষণায় ঢাকার বাতাসে মাত্রারিক্ত বিষাক্ত গ্যাস থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ইট খোলার জ্বালানি হিসাবে নিম্নমালের কয়লার ব্যবহার, কলকারখানায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকা, নদী ভরাটসহ অন্যান্য স্থানের তুলনায় ঢাকায় যান বাহনের সংখ্যা, আশপাশে কলকারখানা ও ইটভাটার প্রসার হওয়ার কারণে ঢাকা শহরে দূষণের মাত্রাও বেশি। মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণে নগরবাসীর পাশাপশি রাজধানীর চারপাশে অবস্থিত নদীগুলোর মাছসহ অন্যান্য জীবের অস্তিত্ব এখন বিপন্ন। স্থানভেদে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সহনীয় মাত্রার চেয়ে দেড় থেকে দুই গুণ বেশি শব্দ উৎপন্ন হচ্ছে। এছাড়া, যথাসময়ে নগরীর বর্জ্য অপসারণ না করায় সেখান থেকেও দূষণ ছড়াচ্ছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, ঢাকার চারপাশে থাকা ইটভাটা, পুরনো মোটারগাড়ি থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া, নতুন রাস্তা সংস্কারের কাজ, যত্রতত্র খোলা ডাস্টবিন থাকায় দিনকে দিন নগরীর বায়ু দূষণের পাশাপাশি বর্জ্যদূষণের মাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে। এ দূষণের কারণে নগরবাসী প্রতিনিয়ত শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুস ক্যান্সার ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এদিকে, ঢাকাকে ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালুসহ অন্যান্য নদ-নদী ক্রমাগত শিল্পবর্জ্যরে কারণে দূষিত হচ্ছে। এসব নদীর পানি ব্যবহারের কারণে হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরীক্ষায়ও দেখা গেছে, ১৩টি নদীর মধ্যে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীর পানির মান খুবই খারাপ। আরও জানা যায়, ঢাকায় পয়ঃবর্জ্যরে পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ঘনমিটার। এসব বর্জ্য পরিশোধনের জন্য পাগলায় এক লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন ওয়াসার পরিশোধনাগার রয়েছে। যেখানে মাত্র ৬০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পরিশোধন করা হচ্ছে। বাকি বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি ভয়াবহভাবে দূষণ হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের নির্বাহী সদস্য ও ‘সুন্দর জীবনের’ প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল ইসলাম মোল্লাহ বলেন, ঢাকায় শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ, নদী দুষণ ও বর্জ্য দূষণের কারণে আমরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। বিশেষ করে ২০০৬ সালের শব্দ দূষণ নীতিমালায় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালকে নীরব এলাকা ঘোষণা করা হলেও এটি সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। যারা এর তদারকি করবেন, খোদ সেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জনবল স্বল্পতার কারণে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, এছাড়া বায়ু দূষণের প্রধান কারণ ধুলাবালি। পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে উন্নয়ন কাজের সময় দূষণ রোধে উদ্যোগ নেওয়া হলেও, আমাদের এখানে তা হয় না। এসব বিষয়ে সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্টদের কোনো উদ্যোগ নিতেও দেখা যায় না। ফলে সব ধরনের দূষণের মাত্রা বেড়েই চলছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, শব্দদূষণ রোধে বিশেষ মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে। ডিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগ, বিআরটিএ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেটগণ এই সমন্বিত অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। অভিযানের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে বিশেষ সমাবেশেরও আয়োজন করা হবে। এছাড়া অন্যান্য দূষণ রোধেও কাজ চলমান রয়েছে।