কুয়াশা ভেদ করে জানুয়ারির সূর্য ওঠে। নগরের ব্যস্ততায় হুইসেল আর বেলের শব্দে আরেকটি কর্মদিবস শুরু হয়। ঠিক এই সময় রাষ্ট্র জানিয়ে দেয়—ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ বিরতির পর ব্যালটে সিল দেওয়ার সুযোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয় রাজনীতি, গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু এই উত্তেজনার ভিড়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন আড়ালে থেকে যায়—যে রাষ্ট্র নাগরিককে ভোটাধিকার দিতে চায়, সে রাষ্ট্র কি নাগরিকের নিরাপদ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছে?
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকট। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয় এবং আহত হয় তার কয়েকগুণ বেশি। এসব হতাহতের বড় একটি অংশই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী—অর্থাৎ দেশের কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী। একটি মৃত্যু মানে কেবল একটি প্রাণহানি নয়; এটি একটি পরিবারকে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের ওপরও।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এবারের ভোটার তালিকায় তরুণদের অংশ উল্লেখযোগ্য। এই প্রজন্ম উন্নয়নকে শুধু উড়ালসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে বা মেগা প্রকল্প দিয়ে বিচার করে না; তারা উন্নয়নকে দেখে জীবনের নিরাপত্তা, আইনের সমতা ও রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবে। তাদের কাছে সড়ক নিরাপত্তা কোনো গৌণ ইস্যু নয়—বরং রাষ্ট্র কতটা কার্যকর, তা বোঝার অন্যতম মানদণ্ড।
সড়ক নিরাপত্তা সংকটের গভীরে তাকালে স্পষ্ট হয়, সমস্যাটি কেবল চালকের অসতর্কতা বা ব্যক্তিগত ভুলে সীমাবদ্ধ নয়। লাইসেন্স প্রদান ব্যবস্থায় দুর্নীতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল, গণপরিবহনের মালিক-শ্রমিক কাঠামোর অনিয়ম এবং সর্বোপরি আইন প্রয়োগে বৈষম্য—সব মিলিয়ে একটি দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তরুণরা এই বাস্তবতা খুব পরিষ্কারভাবেই উপলব্ধি করে। তারা দেখে—সাধারণ নাগরিক নিয়ম ভাঙলে শাস্তি পায়, কিন্তু রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হলে দায়মুক্তি প্রায় নিয়মে পরিণত হয়।
এখানেই সড়ক নিরাপত্তা একটি সরাসরি রাজনৈতিক প্রশ্নে রূপ নেয়। নির্বাচন এলেই সড়ক দখল করে মিছিল, শোডাউন, দ্রুতগতির বহর দেখা যায়। জননিরাপত্তা তখন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। অথচ গণতান্ত্রিক রাজনীতির ন্যূনতম শর্ত হওয়া উচিত—নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা সর্বাগ্রে। তরুণদের প্রশ্ন তাই সরল কিন্তু গভীর—ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় মানুষের জীবন কেন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে?
দুঃখজনকভাবে, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তা বরাবরই প্রান্তিক বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। উন্নয়ন মানেই যেন নতুন রাস্তা, নতুন সেতু, নতুন প্রকল্প। কিন্তু সেই রাস্তার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারী, শিক্ষার্থী বা শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা খুব কমই দেখা যায়। ফলে অবকাঠামো বাড়ে, কিন্তু দুর্ঘটনার হার তেমন কমে না।
তরুণদের দৃষ্টিতে এই উন্নয়ন দর্শন অসম্পূর্ণ। তারা জানে—নতুন সড়ক বানালেই নিরাপত্তা আসে না, যদি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না থাকে। প্রযুক্তি আনলেই সমাধান হয় না, যদি আইন প্রয়োগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হয়। সড়ক নিরাপত্তা আসলে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার মানের প্রতিফলন।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তরুণদের প্রত্যাশা তাই স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট। প্রথমত, সড়ক নিরাপত্তাকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে আনতে হবে—পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য ও সময়সীমাসহ। দ্বিতীয়ত, লাইসেন্স ও ফিটনেস ব্যবস্থাকে পুরোপুরি স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করতে হবে, যাতে দুর্নীতির সুযোগ কমে। তৃতীয়ত, গণপরিবহন সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, কারণ এটি ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। চতুর্থত, আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
উন্নতির পথ নতুন নয়। তথ্যভিত্তিক সড়ক ব্যবস্থাপনা, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট, শিক্ষাব্যবস্থায় বাধ্যতামূলক সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য কঠোর সড়ক ব্যবহারের নীতিমালা—এসবই বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্যোগ। অভাব কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন তাই কেবল সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতার পরীক্ষা। এই নির্বাচন দেখাবে—আমরা কি এমন রাজনীতির দিকে যেতে পারি, যেখানে উন্নয়নের নামে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে না।তরুণরা শুধু ভোটারের পরিচয়েই সীমাবদ্ধ নয়; তারা সামাজিক দায়িত্ব, সচেতন নাগরিকত্ব ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও রাজনীতির মূল্যায়ন করে। তারা দেখছে, একদিকে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর দ্রুত উন্নয়ন হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিদিনই নিত্যনতুন সড়ক দুর্ঘটনা সংবাদে উঠে আসে। ২০২৫ সালের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় ৬৫% দুর্ঘটনায় নিহত বা আহতদের বয়স ১৮–৩৫ বছরের মধ্যে, এবং এর মধ্যে ৭৫% দুর্ঘটনা ঘটে শহর ও ট্রাফিক হাইওয়ে এলাকায়।
এখানেই তরুণরা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব ও নীতিগত অঙ্গীকারের স্বচ্ছতা দেখতে চায়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে শুধু সেতু, মহাসড়ক বা ব্রিজের সংখ্যা উল্লেখ নয়, বরং সড়ক ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকিমুক্তি, জরুরি সেবা ব্যবস্থার দ্রুততা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো বাস্তব পদক্ষেপও থাকতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে কেবল প্রাণরক্ষা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, শ্রমশক্তি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই তরুণরা ভোট দিয়ে শুধু সরকার নয়, নৈতিক এবং দক্ষ প্রশাসনের জন্যও মাপকাঠি স্থাপন করবে। এই প্রজন্ম জানে—ভবিষ্যতের বাংলাদেশ স্থাপনার মূল ভিত্তি হবে নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা।
তারুণ্য আজ ব্যালটের মাধ্যমে সেই প্রশ্ন তুলতে প্রস্তুত। রাষ্ট্র কি তাদের শুধু ভোটার হিসেবে দেখবে, নাকি নিরাপদ জীবনের অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে মূল্য দেবে—এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশের পথ।
লেখক: ইশতিয়াক ইমন, সাধারণ সদস্য, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন