একসময় আমি ছিলাম ঢাকার পরিচিত পথ ঘাটে পরিপাটি হয়ে ছুটে চলা সম্পূর্ণ বাঙালিয়ানায় ভরপুর একজন মেয়ে। চারপাশে থাকতো পরিচিত মুখ, পরিচিত গন্ধ, পরিচিত যানযট, আর নিজের অজানা ভবিষ্যৎ কে ছুঁয়ে দেখার দুরন্ত ইচ্ছা। ঢাকা, শহর টা কেবল আমার জন্মস্থান কিংবা বেড়ে ওঠার সাক্ষী না, বরং আমার তীব্র অনুভূতির ঠিকানা। কিন্তু সেই ঠিকানা কে ছেড়ে আচমকা ভাগ্যের চাকার ব্যপক ঘুর্ণনের টানে আমি ছিটকে এসে পরলাম ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরে-নিউইয়র্কে!
ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল আমার কংক্রিটের চেনা শহর, পেছনে রয়ে গেল পরিচিত সব মুখ, শব্দ, স্পর্শ। ঢাকা শহরের পরিচিত দেয়ালগুলো আমাকে আর ধরে রাখতে পারলো না। পরিস্থিতির অদ্ভুত টানে অপ্রত্যাশিতভাবে আমার জীবন্ত মুহুর্ত গুলো হয়ে গেল স্মৃতি। সামনে খুলে গেল অচেনা শহরের বিশাল এক ফটক। সুউচ্চ দালান, দ্রুতগামী জীবনযাত্রা, ব্যস্ত মানুষের ভীড়। উঁচু দালানের ছায়া আর মানুষের অবিরাম গতি দেখে একবার মনেহয় আমি যেন একটি চলমান যন্ত্রের ভেতর ঢুকে পড়েছি, আবার সাজানো গোছানো ছবির মত পথঘাট-ঘরবাড়ি দেখলে মনেহয় আমি যেন কোনো সিনেমার ভেতর ঢুকে পড়েছি। তাই পথ কে গুরু মেনে নিজের অজানা সত্তার সঙ্গে পরিচয়ের উদ্দেশ্যে আমি ভ্রমণে মন দিলাম। নিউইয়র্কের দিনাতিপাত শুধু কোনো ভ্রমণ কাহিনী নয়, বরং অনেকের স্বপ্নের বাস্তবতায় বিচরণ।
নিউইয়র্ক মানেই স্ট্যাচু অব লিবার্টি! স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখতে ফেরিতে উঠলাম। দূর থেকে ধীরে ধীরে যখন মূর্তিটা কাছে এলো, তখন মনে হল যেন আমি বিশ্ব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের অংশ। এই প্রতীকী মূর্তিটি যেন আমেরিকার স্বাধীনতার মন্ত্রকে জীবন্ত করে রেখেছে।
ঢাকার দোয়েল চত্বর, শাপলা চত্বরের মত নিউইয়র্কে এক চত্বর আছে। পশ্চিমা ঢঙে এই চত্বরের নাম দেয়া হয়েছে স্কোয়ার- টাইমস স্কোয়ার!! অকারণে চেঁচিয়ে ওঠা এক উৎসবের স্থান হল এই টাইমস স্কোয়ার। চারপাশে জ্বলজ্বলে বিলবোর্ড, সেলিব্রিটি পোস্টার, একটানা চলতে থাকা বিশাল বিশাল স্ক্রিনে রঙিন সব বিজ্ঞাপন, নাচ, গান, হৈ হৈহল্লা, কোলাহল, চাকচিক্য, আর মানুষের স্রোত। টাইমস স্কোয়ারের আলো আমাকে মুগ্ধ করেনি। বরং মনে হয়েছে এত এত কৃত্রিম আলোতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কে ঢেকে ফেলার চেষ্টা চলছে। এত আলোতে ঝলছে যাচ্ছে সব...অল্প আলোতে ঘর সাজানো এবং মাইনাস পাওয়ারের কাঁচে টুকরো চোখে নিয়ে ঘুরতে থাকা নারীর জন্য এত আলোর ঝলকানি ঠিক সহজপাচ্য নয়। চোখের বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটে। টাইমস স্কোয়ার সেই বিশ্রামের ভাষা শিখায় না। ম্যানহাটনের অট্টালিকা গুলোও ঠিক একই অনুভূতি দেয়, যেন গোটা পৃথিবী টাই এই এক শহরের মধ্যেই ঢুকে পড়েছে।

এ শহরের পার্ক গুলো আবার ভিন্ন চিত্র দেখায়। ব্যস্ততার মাঝে এক টুকরো স্বস্তি হয়ে দাড়িয়ে থাকে পার্কগুলো। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটা যায় নির্ভয়ে, নীরবতার স্বাদ অনুভব করা যায়। আশ্চর্যজনকভাবে এত ব্যস্ত আড়ম্বরপূর্ণ শহরের মাঝে হঠাৎই শব্দ কমে আসে পার্কগুলোতে পা রাখলে। পার্কে মানুষ থাকে, কিন্তু কোলাহল থাকে না। বেঞ্চে বসে কেউ বই পড়েন, কেউ ব্যায়াম করেন, কেউ গান করেন, শিশুরা খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকে, কেউবা মাছ ধরেন। মানুষ তাদের ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা বিরতি নিয়ে প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে পার্ক গুলোকেই বেছে নেয়। পার্কের পরিবেশে গিয়ে মনেহল শহরটা যেন এবারই প্রথমবার আমার দিকে তাকালো কোনো দাবি ছাড়াই। পার্কের নিরিবিলি পরিবেশে গিয়ে বুঝলাম নিউইয়র্ক নিজেকে একবারে দেখায় না। সে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়!
একে একে তিনটি ঋতুই উপভোগ করলাম এই নতুন শহরের। ঝঁসসবৎ, অঁঃঁসহ, ডরহঃবৎ. সাত মাস, তিন ঋতু আর একটি শহর। তিন ঋতুতে শহরটা তিনটি ভিন্নরূপে নিজেকে মেলে ধরেছে আমার কাছে।
গ্রীষ্মে নিউইয়র্ক থাকে উচ্ছ্বল, রোদ ঝলমলে কাঁচের দেয়াল গুলোতে প্রতিফলিত হতে থাকে অজানা আগামী, রাস্তায় রাস্তায় বাড়ে জীবনের গতি।
শরতে গোটা নিউইয়র্ক যেন কবি হয়ে উঠে। গাছের পাতাগুলো হলুদ, কমলা, লাল আর বাদামীর মিশেলে প্রকৃতিতে তৈরি হয় রঙের খেলা। যদিও এই রঙ খেলা স্থায়ী হয়না বেশিদিন। অল্প কিছুদিনের মাঝেই প্রকৃতি এই রঙ হারায়। নীরবে ঝড়ে পরতে শুরু করে পাতাগুলো।
শরতের এত রঙিন পরিবেশেও আমি কাশফুলের অনুপস্থিতি টের পেলাম। কাশফুল ছাড়া শরত যেন শূন্য লাগে। শরতের মৃদু বিদায় প্রকৃতিতে নিয়ে এলো ঠান্ডা হাওয়া...আর সেই হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে প্রকৃতি তে প্রবেশ করলো শীত।
নিউইয়র্কের শীতকাল কঠিন, নির্দয় তবে শিক্ষনীয়। এই ঋতুতে বিকেলেই অন্ধকার নামে। এই শীত কথা বলে কম, অনুভব করায় বেশি। তুষারে আবৃত শহর আমাকে একাকীত্বের স্বাদ যেমন দিয়েছে, তেমন আবার শক্ত হওয়ার পাঠও দিয়েছে। ঠান্ডার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ শেখায় মাইনাস তাপমাত্রায় জমে যাওয়া আঙুলগুলো দিয়ে নিজের স্বপ্নকে উষ্ণ রাখার উপায়।
নিউইয়র্ক কে এখন আর আমার বিরুদ্ধে মনেহয়না। এই অচেনা দেশে দাঁড়িয়েও আমি বয়ে বেড়াই বাংলাদেশের আত্মা। আমার উচ্চারণে আছে মাতৃভাষার ছাপ। নিউইয়র্ক একটি মহাকাব্যিক শহর, যেখানে মানুষের গল্প, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সফলতা প্রতিটি কোণায় কোণায় লুকিয়ে থাকে। এ শহরের প্রতিটি পথচলতি ব্যক্তি এক একটি জীবনের গল্প বলে যায়। এখানে কেউ থামে না, কেউ তাকায় না, সবাই কেবল নিজের গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে ব্যস্ত। অতিরিক্ত উজ্জ্বল, কোলাহলমুখর, মানুষের ভিড়ে নিজের ছায়া হারিয়ে ফেলার মত একটা শহর। যেখানে রাস্তার শব্দগুলোও কথা বলার আগে দু'বার ভেবে নেয়। এই শহর কখনো ক্লান্ত হয় না, শুধু এগিয়ে যেতে জানে। অনেকেই নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসেন এই দেশে। কিন্তু এই দেশ আসলে পালানোর জায়গা নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া মানুষদের আশ্রয়স্থল। নিউইয়র্ক কাউকে স্বাগত জানায় না, শুধু গ্রহণ করে।
তবে বলতেই হবে- নিউইয়র্ক শহর টা সৎ..! সে ভান করে না। যে যেমন, তাকে ঠিক তেমনভাবেই থাকতে দেয়।