নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনে জয় পেয়েছেন জোহরান মামদানি, যা শহরের রাজনীতিতে এক নতুন প্রগতিশীল যুগের সূচনা করেছে এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ও প্রথম মিলেনিয়াল মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। একটি প্রচারণার পর যেটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ রাজনৈতিক উত্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমোকে পরাজিত করেছেন, যিনি ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে মামদানির কাছে হেরে স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। রিপাবলিকান কার্টিস স্লিওয়াকেও হারিয়ে মামদানি বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামসের উত্তরসূরি হচ্ছেন।
মামদানি তাঁর প্রচারণায় মূল গুরুত্ব দিয়েছেন জীবনযাত্রার ব্যয় ও ভাড়ার সংকটে। তিনি ভাড়া স্থগিত রাখা, সিটি-স্বত্বাধীন মুদি দোকান চালু করা এবং নগরবাসীর জন্য বাসযাত্রা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁর এসব নীতিই তাঁকে দ্রুত প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতীক বানালেও একইসঙ্গে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরি করেছে বিশেষত নিউইয়র্কের অনেক প্রভাবশালী নেতারা তাঁকে সমর্থন দেবেন কি না, তা নিয়েও তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।
তবে নির্বাচনের সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যু ছিল ইসরায়েল-হামাস সংঘাত নিয়ে তাঁর অবস্থান।
“গ্লোবালাইজ দ্য ইন্তিফাদা” স্লোগানটি প্রথমে নিন্দা না করায় মামদানিকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। যদিও তিনি নিজে কখনও এ স্লোগান ব্যবহার করেননি, প্রো-ইসরায়েল কর্মীরা দাবি করেন এটি ইহুদি ও জায়নিস্টদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উস্কে দিতে পারে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীরা এটি ফিলিস্তিনি মুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখেন।
পরবর্তীতে মামদানি ঘোষণা করেন, তিনি নিজে এই শব্দটি ব্যবহার করবেন না এবং অন্যদেরও তা থেকে বিরত থাকতে উৎসাহ দেবেন। কিন্তু কুয়োমো এ বিষয়টি তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
মামদানি আরও সমালোচিত হন ইসরায়েলবিরোধী মন্তব্যের কারণে। তিনি ইসরায়েলকে গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেন এবং ঘোষণা দেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওয়ারেন্ট কার্যকর করতে হলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে নিউইয়র্কে পা রাখলেই গ্রেপ্তার করা উচিত।
এছাড়া অতীতে পুলিশবিরোধী মন্তব্য ও 'ডিফান্ড দ্য পুলিশ' আহ্বানের কারণেও তাঁকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তবে পরবর্তীতে ফক্স নিউজে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান।
অন্যদিকে কুয়োমো, যদিও রাজ্যের অভ্যন্তরে ও বাইরে বহু ডেমোক্র্যাট নেতার সমর্থন পেয়েছিলেন এবং দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হিসেবে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, তাঁর অতীত বিতর্ক তাঁকে দুর্বল করে দেয়। ২০২১ সালে যৌন হয়রানির অভিযোগে গভর্নর পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি যদিও সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ বছর শুরুর দিকে বিচার বিভাগ কুয়োমোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে, কোভিড মহামারির সময় নার্সিং হোমে মৃত্যুহার সংক্রান্ত এক স্বাস্থ্য প্রতিবেদন নিয়ে কংগ্রেসে দেওয়া তাঁর সাক্ষ্য নিয়ে রিপাবলিকানদের চাপের প্রেক্ষিতে। কুয়োমো এক বিতর্কে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন তাঁকে তদন্ত করছে না।
তাছাড়া রিপাবলিকান কার্টিস স্লিওয়া নির্বাচনে থেকে না সরে দাঁড়ানোয় ভোট ভাগ হয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত মামদানির জন্য সুবিধাজনক প্রমাণিত হয়। এমনকি মেয়র অ্যাডামস প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে কুয়োমোকে সমর্থন জানানোর পরও স্লিওয়া দ্বিগুণ অঙ্কের ভোট ধরে রাখেন।
নির্বাচনের শেষ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কুয়োমোকে সমর্থন জানালেও, গভীর নীল রাজ্য নিউইয়র্ক সিটিতে তা কোনো প্রভাব ফেলেনি—বরং বিপরীত প্রতিক্রিয়াই দেখা যায়।
মামদানির এই ঐতিহাসিক জয় অনেক ডেমোক্র্যাটকে উদ্দীপ্ত করেছে, তবে তাঁর সামনে এখনো বহু প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে—বিশেষ করে তিনি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবেন তাঁর উচ্চাভিলাষী প্রগতিশীল কর্মসূচি, এবং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারবেন তা নিয়েই এখন মূল আগ্রহ।
মামদানির বিজয় একইসঙ্গে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ বিভাজন নিয়েও নতুন বিতর্ক উত্থাপন করেছে—তিনি কি সত্যিই সেই ভবিষ্যৎকে প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে দলটি তার বামপন্থী শাখা ও মধ্যপন্থী, প্রাতিষ্ঠানিক ধারা—যেমন সিনেট সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমারের মতো রাজনীতিবিদদের মধ্যবর্তী ভারসাম্য খুঁজে পাবে?