প্রকাশ: বুধবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৫, ১১:০২ এএম আপডেট: ০৫.১১.২০২৫ ১১:৫১ এএম (ভিজিটর : ৩৬০)
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিসহ নানা সংকটে রয়েছে দেশ। সম্প্রতি এর সাথে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সংকট। মূলত জাতীয় নির্বাচনে পিআর পদ্ধতিতে হওয়া না হওয়া, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং গণভোটের সময় নিয়ে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু দলের মতবিরোধসহ নানা ইস্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এক অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। তবে এ সংকট যাতে আরো ঘনীভূত না হয় এজন্য যে কোন উপায়ে সমাধান চায় জামায়াত।
এ বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে বিএনপিসহ অন্য দলগুলোকে একসাথে বসে আলোচনার মাধ্যেমে সমাধানের আহবান জানানো হলেও এখন পর্যন্ত তেমন একটা সারা মিলেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির সঙ্গে এক সময়ের মিত্র জামায়াতের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দল দুটির সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আসে। বর্তমানে সংস্কার আগে নাকি নির্বাচন আগে এই প্রশ্নে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়ে দুই দল একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তবে বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখছে না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বিএনপি ও জামায়াতের অধিকাংশ নেতাকর্মী গত ১৭ বছর নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে নানা বিষয়ে একে অপরের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় যে কোন সময় দুই দলের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। তবে গত কয়েকমাসে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ হয়েছে জামায়াতেরই। নানা ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দল দুটির কর্মী-সমর্থকদের পরস্পরের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণাও থেমে নেই। তাছাড়া, একসঙ্গে সরকারে এবং দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা দল দুটির প্রভাবশালী নেতারা প্রকাশ্যে একে অন্যের কড়া সমালোচনা করছেন। তুলছেন নানা অভিযোগও। এমনি বিএনপির এক নেতা জামায়াতকে নিষিদ্ধেরও দাবি তুলেছেন। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সংকট বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাই এই দুই দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল একসাথে বসে এর একটা সমাধান হওয়া উচিত বলে তারা মনে করছেন। আর যদি তারা সমাধানে না এসে সংঘাতে জড়ায় তাহলে নির্বাচন পেছানোসহ নানা সংকট সৃষ্টি হবে। এতে তৃতীয় পক্ষ এর সুবিদা নেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা যায়, এক বছর আলোচনা করেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে শেষ পর্যন্ত একমত হতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধ রেখেই দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত সমন্বয় করে কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের কাছে সুপারিশ দেয়। এরপর জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে বিএনপি-জামায়াতসহ অধিকাংশ দল। কিন্তু এরপরও দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা যাচ্ছে। বিএনপিসহ কিছু দল জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোটের পক্ষে অনড়। আর জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপিসহ কিছু দল জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়। এদিকে, গণভোটের প্রশ্ন কী থাকবে, ভিন্নমত থাকা প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে-এসব প্রশ্নেও সুরাহা হয়নি। এর খসড়া চূড়ান্ত হলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য হয়নি। ফলে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ, দেশের রাজনীতিকে আবারও এক অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। জুলাই সনদ নিয়ে অচলাবস্থা ছাড়াও বেশ কিছু ঘটনা গণতন্ত্রের উত্তরণে বাধা সৃষ্টি করছে বলেই অনেকে মনে করছেন। এমতাবস্থায় সব রাজনৈতিক দলগুলোকে একসাথে সবার প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াত। কিন্তু বসার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত আসেনি।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, আসছে ফ্রেব্রুয়ারীতে নির্বাচনে বিএনপি জামায়াত দুই দলই ক্ষমতায় আসতে চায়। এতে একটা ক্ষমতার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিযোগিতা থাকলেও ফ্যাসিবাদবিরোধী এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে পাশাপাশি থাকা দু-দলকেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য দেশের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন না হলে তা হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। জনগণ সেটা মেনে নেবে না। দেশে এখন নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। সবকিছু অচল হয়ে আছে। একটি নির্বাচিত সরকারই পারে এ অচলাবস্থার অবসান। বাংলাদেশের গণতন্ত্র একাধিকবার সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই জাতি পথ খুঁজে নিয়েছে। এবারও সেই সুযোগ আছে-যদি রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপ ও সমঝোতার পথে ফিরে আসে। কিন্তু যদি বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তাহলে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু অনিশ্চিতই নয়, বরং জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য নতুন ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে। তাই সংকট সমাধানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। এ বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং গণভোটের সময় নিয়ে সৃষ্ট বিরোধসহ নানা সংকট নিরসনে খোলামেলা আলোচনায় বসতে বিএনপিকে আহ্বান জানানো হয়েছে। আমরা এ নিয়ে বিএনপির সাথে কোন ধরনের ঝগড়ায় যেতে চাই না। আমরা দেশের স্বার্থে আলোচনা করেই এর সমাধান করতে চাই।