গণভোটের সময়সীমা নির্ধারণ ইস্যুতে বিপরীত অবস্থানে রয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে করার পক্ষে বিএনপি। তবে জামায়াত চায় চলতি মাসেই গণভোট হোক। এ ইস্যু নিয়ে এখনো কোনো দৃশ্যমান সমঝোতা হয়নি দুই দলের মধ্যে। এবার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-আরপিওর ২০ ধারা সংশোধন ইস্যুতে বিপরীত অবস্থান নিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি-এসসিপির অবস্থানও এ ইস্যুতে জামায়াতের পক্ষে। ফলে নতুন এই ইস্যু নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত।
২৩ অক্টোবর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-আরপিও সংশোধন, ২০২৫-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন করে উপদেষ্টা পরিষদ। এতে বেশ কিছু পরিবর্তনের মধ্যে ইভিএম ব্যবহার বাতিল, ‘না ভোট’ পুনর্বহাল, পলাতক আসামিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার মতো সিদ্ধান্তের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা। এর পর পরই নতুন করে আলোচনায় এ আসে আরপিও সংশোধনী। নতুন নিয়মে, জোটভুক্ত হলেও জোটের প্রধান দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে পারবেন না শরিক দলের প্রার্থীরা। এ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে একতরফাভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ বিএনপির। এ সংক্রান্ত আইন বাতিলে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন এবং আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছে দলটি। সরকারও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নয় বলে জানা গেছে। তবে জামায়াত নির্বাচন কমিশনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। এই ইসু্যুতে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিও জামায়াতের সুরে সুর মেলাচ্ছে।
গতকাল রোববার এ ইস্যুতে বিবৃতি দিয়ে বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, একটি দলের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় সরকার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সংশোধনী বদল করছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নির্বাচনে জোট গঠিত হলেও প্রার্থীদের নিজ দলের প্রতীকে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে- গত ২৩ অক্টোবর এমন বিধান সংযোজন করে নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের খসড়া অনুমোদন করে উপদেষ্টা পরিষদ। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিএনপির একজন নেতার সঙ্গে জনৈক উপদেষ্টার তথাকথিত ‘জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্ট’-এর মাধ্যমে নিজেদের অনুমোদিত সেই আদেশ বাতিল করতে যাচ্ছে সরকার। গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদিত আরপিও যদি বাতিল হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক, অগণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলছেন, এর আগে একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের নেতা ও সরকারের মধ্যে অবস্থানকারী কোনো উপদেষ্টার যোগসাজশে যদি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নষ্ট হয়, তাহলে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এবং সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে আরপিও বহাল রাখার আহ্বানও জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।
এদিকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর ২০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়ে আইন উপদেষ্টার কাছে চিঠি দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এসিপি। গতকাল দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিটি গণমাধ্যমের কাছে প্রদান করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিক উস সালেহীন। চিঠিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ২০ অনুচ্ছেদ সংশোধন সংক্রান্ত আলোচনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে দেওয়া আপনার ব্যক্তিগত আশ্বাস ও অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, একজন উপদেষ্টা হিসেবে আপনি রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ আইন উপদেষ্টা, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন। নির্বাচনী আইন সংশোধনের মতো বিষয়ে কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে এককভাবে আশ্বাস প্রদান করা জুলাই গণঅভুথান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদের নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতার পরিপন্থি।
চিঠিতে বলা হয়, একইসঙ্গে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ২০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে আপনি নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও নির্বাচন কমিশনের বিপরীতে যে অবস্থান নিয়েছেন তা সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থি বলে আমরা মনে করি। আরপিও-১৯৭২ এর ২০ অনুচ্ছেদ সংশোধন কেন থাকা উচিত, তার পক্ষে তিনটি যুক্তি উপস্থাপন করেছে এনসিপি।
এর আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) একটি ধারা সংশোধনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দলটির একটি প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করে চিঠি দিয়েছে। এতে আরপিওর ২০ নম্বর ধারা সংশোধন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে দলটি। ইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, আরপিওর এ সংশোধনীর সঙ্গে বিএনপি একমত নয় এবং এর সংশোধন বা পরিবর্তন বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে এবং দলের বা জোটের প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে অংশ নিয়েছে। এটা রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার।