ই-পেপার বাংলা কনভার্টার মঙ্গলবার ● ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪৩২
ই-পেপার মঙ্গলবার ● ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
Select Year: 
ব্রেকিং নিউজ:



ধেয়ে আসছে বন্যা, ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে ফেনী
সাইদুল ইসলাম :
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০২৫, ১:৩৬ পিএম আপডেট: ১০.০৭.২০২৫ ১:৫২ পিএম  (ভিজিটর : ১৫৩)
সাগরে সৃষ্টি হওয়া লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে টানা মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে তীব্র বজ্রপাত। টানা বৃষ্টির ফলে এবার ধেয়ে আসছে বন্যা। ইতিমধ্যে ফেনীতে ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারতের উজানের পানিতে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কয়েকটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। 

এতে সীমান্তবর্তী ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ভোগান্তিতে রয়েছেন হাজারো মানুষ। বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে যানচলাচল। এছাড়া, কুমিল্লায় টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গোমতী নদীর পানি বাড়ায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, চট্রগ্রাম বিভাগের মিরসরাই, নোয়াখালী,চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, খাগড়াছড়ি ও মাদারীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালিসহ বিভিন্ন জেলা শহরে ভারী বর্ষণে  জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে বেশ কয়েকটি জেলা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছ।

এদিকে, ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তায় আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সক্রিয়তার কারণে গতকাল বুধবার সকাল ১০টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (৪৪-৮৮ মি.মি./২৪ ঘণ্টা) থেকে অতি ভারী (১৮৮ মি.মি./২৪ ঘণ্টা) বর্ষণ হতে পারে। এছাড়া, অতি ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভ‚মিধ্বসের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে ভারী বর্ষণজনিত কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। তাছাড়া, আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার মধ্যে রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

ফেনীতে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা, যোগাযোগ ব্যাহত : টানা বর্ষণে ফেনী শহরের প্রধান প্রধান সড়ক এখনো পানির নিচে রয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে ফেনী শহরের শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কে ২-৩ ফুট ওপর দিয়ে পানি গড়িয়েছে। তবে দ্রুত পানি সরাতে কাজ করছেন ফেনী পৌর প্রশাসকসহ কর্মকর্তারা। এছাড়া, পুলিশ ফাঁড়ি, ডা. হায়দার হাসপাতাল সড়ক, এসি মার্কেটের সামনে, পুলিশ কোয়ার্টার রাস্তার মাথা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্টার লাইন বাস টার্মিনাল, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ পুরো সড়ক জুড়ে পানি রয়েছে। পানির মধ্যে বিভিন্ন যানবাহনে করে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে মানুষ। বিভিন্ন উপজেলায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। দুর্গতদের অভিযোগ, বাঁধ ভাঙার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও এখনো প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা মেলেনি।

জানা গেছে, মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পরশুরাম উপজেলার জঙ্গলঘোনায় দুইটি, অলকায় তিনটি, শালধর এলাকায় একটি, ফুলগাজী উপজেলার উত্তর শ্রীপুর এলাকায় একটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সিলোনিয়া নদীর পরশুরামের গদানগর এলাকায় একটি ও ফুলগাজীর দেড়পড়া এলাকার দুইটি স্থানে ভেঙেছে। এছাড়া কহুয়া নদীর পরশুরাম উপজেলার সাতকুচিয়ায় দুইটি, বেড়াবাড়িয়ায় একটি ও ফুলগাজী উপজেলার দৌলতপুর এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের একটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল থেকে এসব স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। তীব্র স্রোতে পানি প্রবেশ করছে।  এখনো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

ফুলগাজী এলাকার বাসিন্দারা জানান, বৃষ্টি কিছুটা কমেছে। তবে যেখানে যেখানে বাঁধ ভেঙেছে সেসব স্থান দিয়ে এখনো পানি ঢুকছে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গেল বছরের বন্যার মতো এবারও মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যা নিয়ে ভুগতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।

ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, জেলায় টানা তিন দিন ধরে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গতকাল বুধবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে মঙ্গলবারের তুলনায় বুধবার বৃষ্টিপাত কমেছে। আজ বৃহস্পতিবার জেলাজুড়ে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকে বাঁধের কোনো স্থানে নতুন করে ভাঙেনি। লোকালয়ে পানি ঢুকে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। আমরা দুর্গতদের পাশে থেকে কাজ করছি। 

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তার হোসেন মজুমদার বলেন, আমরা সকাল পর্যন্ত ১১টি স্থানে ভাঙনের তথ্য পেয়েছি। এই বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে মধ্যরাত থেকে পানি কিছুটা কমেছে। উজানে বৃষ্টি বন্ধ থাকলে বাঁধে আর নতুন করে ভাঙন দেখা দেবে না। 

এদিকে, টানা দুই দিন হাঁটু ও কোমর পানিতে নিমজ্জিত ফেনী শহরে পানি কিছুটা নেমেছে। অনেকের বাসা-বাড়ি থেকেও পানি সরেতে শুরু করায় কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছেন শহরের বাসিন্দারা। তবে নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে একই রকম ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন তারা। ফেনী শহরের একাডেমি এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, কিছু সড়কে মঙ্গলবার কোমর সমান পানি ছিল। বৃষ্টি কমার পর পানি অনেক নেমে গেছে। তবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল না থাকায় পানি ধীরগতিতে নামছে। পৌরসভা ও জেলা প্রশাসন যদি খালগুলো দখলমুক্ত না করে এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করে তাহলে এভাবে বৃষ্টিতে আমাদের বারবার দুর্ভোগে পড়তে হবে। 

কুমিল্লায় বন্যার শঙ্কা : টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হু হু করে বাড়ছে কুমিল্লার গোমতী নদীর পানি। ফলে জেলার কয়েকটি উপজেলায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে গোমতী নদীর পানি ৮ দশমিক ৫৬ সেন্টিমিটারে প্রবাহিত হতে দেখা গেছে। যা বিপৎসীমার ৩ মিটার নিচে। গোমতী নদীর বিপৎসীমা ১১ দশমিক ৩ সেন্টিমিটার। কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আকস্মিক ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে গত ২৪ ঘণ্টায় গোমতীর পানি ৫ মিটারের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। 

কুমিল্লা অঞ্চলের পাশাপাশি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যেও ব্যাপক বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ওই রাজ্যের পানি গোমতী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুমিল্লা অংশের দিকে নামছে। কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মো. ওয়ালিউজ্জামান বলেন, টানা ভারী বর্ষণ আর উজানের ঢলে গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃষ্টি থেমে গেলে এবং উজানের ঢল বন্ধ হলে বিপদ কাটতে পারে। নতুবা বন্যার শঙ্কা রয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন তিনি। অপরদিকে কুমিল্লা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বিকেল ৩টা থেকে আজ বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১২৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একটি ভারী বর্ষণের সংকেত রয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায়ও এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। 

কুমিল্লা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আরিফ বলেন, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। সাগরে একটি লঘুচাপ আছে, তবে সেটি অনেক দূরে ভারতের অংশে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য আবহাওয়ার একই পূর্বাভাস রয়েছে। এদিকে গোমতীর পানি বৃদ্ধির ফলে বন্যার আগাম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে বন্যার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আমাদের ৫৮৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও জিআর চাল মজুত আছে। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, পাহাড় ধসের শঙ্কা : চট্টগ্রামে গতকাল সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে কর্মজীবী এবং শিক্ষার্থীদের। বৃষ্টির পরিমাণ আরও বেড়ে যাওয়ায় পাহাড় ধসের সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। কখনো অঝোর ধারায়, আবার কখনো থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে চট্টগ্রাম নগরীসহ আশপাশের এলাকায়। এতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে সড়ক ডুবে গেছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল বুধবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। 

টানা বৃষ্টিতে নগরীর আগ্রাবাদ, জিইসি মোড়, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, কেবি আনাম আলী রোড়, কাপাসগোলা, বাদুরতলা, রাহাত্তারপুল, বহদ্দারহাট এলাকায় কোথাও কোথাও সড়ক ও অলিগলির রাস্তা পানিতে ডুবে গেছে। এরপরও বৃষ্টির মধ্যে সকালে কর্মস্থল ও স্কুল-কলেজে যাওয়ার জন্য বের হয়ে অনেককেই ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে বৃষ্টির কারণে সকালে গণপরিবহন কম থাকায় ভোগান্তি বেশি হয়েছে। এদিকে ভারী বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসের সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া অফিস। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা না মেনে কাটা পাহাড়াগুলোতে ধস হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়া বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধ্বসের আশঙ্কা রয়েছে।

মিরসরাইয়ের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, পানিবন্দি মানুষ : চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে চারদিনের টানা ভারী বর্ষণে আবারও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে মানুষ। জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। কর্মহীন হয়ে পড়েছে শ্রমজীবী অনেকে। বৃষ্টির পানিতে উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের ফেনাপুনি, দুয়ারু, পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ড, মায়ানী ইউনিয়নের পূর্ব মায়ানী গ্রামের ৫ শতাধিক বাড়ি-ঘর প্লাবিত হয়েছে।

জানা গেছে, রোববার থেকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় পানি ঢুকেছে। তখন থেকে প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন এলাকা। খৈয়াছরা খাল সংস্কার বন্ধ থাকায় পানিবন্দি হয়েছে ওই এলাকার শতাধিক পরিবার। এদিকে আবুতোরাব এলাকায় আবুতোরাব-গোভনীয়া খালের পানিতে ভেসে গেছে আবুতোরাব-বড়তাকিয়া সড়ক। প্লাবিত হয়েছে সরকারটোলা এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়িঘর। মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, টানা বৃষ্টিতে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে জলাবদ্ধার খবর পেয়েছি। আমাদের কাছে শুকনো খাবার রয়েছে। তালিকা করে পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়া গতকাল বুধবার দুপুর ১২টায় উপজেলার শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি মিটিং আহ্বান করা হয়েছে।

পটুয়াখালীতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত, বিপর্যস্ত জনজীবন : টানা বৃষ্টিতে ভাসছে উপক‚লীয় জেলা পটুয়াখালী। মঙ্গলবার রাত ৯টা পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা এ জেলার ইতিহাসে একদিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর আগে ২০২১ সালের ২৭ জুলাই পটুয়াখালীতে সর্বোচ্চ ২৫১.৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ ও আশপাশের এলাকায় একটি লঘুচাপ বিরাজ করছে। এর ফলে উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় উপক‚লে বৃষ্টির মাত্রা বেড়েছে। এই অতিভারী বৃষ্টিপাতে পটুয়াখালী পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। ছোট চৌরাস্তা, তিতাস মোড়, এসডিও রোড, সবুজবাগ, নতুন বাজার, জুবলী স্কুল রোড, টিবি ক্লিনিক, পুরান বাজারসহ বেশ কিছু নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এখনো বিটাইপ এলাকা, এলজিইডি কার্যালয়ের সামনে, এখনো জলাবদ্ধতায় আটকে আছে। তিতাস মোড় এলাকার রাব্বি বলেন, টানা বৃষ্টিতে রাস্তাগুলো পানির নিচে চলে গেছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ময়লা আবর্জনা থাকায় সব কিছু আটকে পানি যায় না।

চরপাড়া এলাকার নোমান মিঠু বলেন, টানা বৃষ্টির পাশাপাশি আমাদের কারণে ড্রেনে ময়লা আবর্জনা সরাসরি ফালানোয় ড্রেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পানি দ্রæত চলাচল করছে না, বৃষ্টির পানি শহরে থেকে যায় এই কারণেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এদিকে শুধু শহরেই নয়, জেলার গ্রামাঞ্চলেও দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। সদর উপজেলার বড় বিঘাই এলাকার বাসিন্দারা জানান, মাছের ঘের আর পুকুর পানিতে ছুঁইছুঁই অবস্থা। বৃষ্টিতে নাজেহাল অবস্থা, গ্রামের রাস্তা ঘাট ডুবে আছে। পটুয়াখালী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবা সুখী বলেন, উপক‚লীয় এলাকায় অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। পটুয়াখালীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২৭৫ মিলিমিটার। এই বৃষ্টি আরোও কিছু দিন চলমান থাকবে।

হাঁটুপানিতে বরিশাল নগরীর বিভিন্ন সড়ক : টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকা। এতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে হাঁটুপানি জমেছে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ওইসব এলাকার বাসিন্দারা। বিশেষ করে বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্র বটতলা থেকে চৌমাথা সড়ক, বগুড়া রোডের একাংশ, রাজাবাহাদুর সড়কসহ অলিগলিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া নগরীর চৌমাথা সিএন্ডবি রোড সংলগ্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি), শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বিএম কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে। বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা কালু জানান, যতই খাল খনন আর ড্রেন পরিষ্কার করুক, বটতলা থেকে চৌমাথা সড়ক সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায়। তাই বাসা থেকে বের হয়ে বাজারসহ সব কাজই হাঁটুপানির মধ্যে করতে হচ্ছে। রিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের জলানুসন্ধান বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম বলেন, গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত বরিশালের কীর্তনখোলাসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে নদীর পানি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এসব নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বরিশাল আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আনিসুর রহমান বলেন, গতকাল বুধবার সকাল ৯টা নাগাদ ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকায় আরও কিছুদিন বৃষ্টি থাকবে।

চাঁদপুরে জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ : টানা দুইদিনের বৃষ্টিতে চাঁদপুরে বেড়েছে জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগ। কখনো মাঝারি, আবার কখনো ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে রয়েছেন শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ। বিশেষ করে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় অনেক বসতঘর পানি ঢুকে পড়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চাঁদপুর শহরে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। শহরের বিষ্ণুদী মাদরাসার রোড, নাজির পাড়া, রহমতপুর কলোনীসহ বেশ কিছু সড়কে জলাবদ্ধতা রয়েছে। এতে করে দুর্ভোগে পড়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। এদিকে টানা বৃষ্টিতে জেলার গ্রামীণ সড়কগুলো ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি শাহরাস্তি ও ফরদিগঞ্জ উপজেলায় গেল বছরের মতো জলাবদ্ধতায় শিকার স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্যদিকে যাত্রী সংকটে লঞ্চ চলাচলে শিডিউল বিপর্যয় হয়েছে। যাত্রী পেলে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর ছাড়ছে লঞ্চ। চাঁদপুর জেলা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা শাহ মো. শোয়েব জানান, গত ৪৮ ঘণ্টায় সকাল ৬টা পর্যন্ত ১২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত তা বেড়ে ১৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। বৃষ্টিপাত আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।

মাদারীপুর শহরে জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগে মানুষ : মাদারীপুরে টানা চারদিনের বৃষ্টিতে শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে দুর্ভোগে পড়েছেন শহরবাসী। বৃষ্টির কারণে প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। গতকাল বুধবার (মাদারীপুরে সারাদিন বৃষ্টি হয়। এতে করে শহরের বিভিন্ন সড়কেও পানি জমে যায়।

চারদিনের টানা বৃষ্টিতে মাদারীপুর শহরের অনেক সড়কেই পানি জমে গেছে। এরমধ্যে পুরাণ বাজার, হামিদ আকন্দ সড়ক, ডা. অখিল বন্ধু সড়ক, শহীদ মানিক সড়ক, মন্টু ভ‚ঁইয়া সড়ক, শহীদ বাচ্চু সড়ক, পাবলিক লাইব্রেরি রোডসহ শহরের বেশকিছু সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া শহরের শকুনি এলাকা, থানতলী, পাকদী, পানিছত্র, গোলাবাড়ি, পুরানবাজার, কুলপদ্বীসহ বেশ কিছু এলাকার নিচু ঘরবাড়িতেও ঢুকে গেছে পানি। মাদারীপুর পৌরসভার প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুল আলম বলেন, শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতার স্থানীয় সমাধানের বিষয়ে কাজ করা হবে।

পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে বিলীনের মুখে নাজিরগঞ্জ ফেরিঘাট : পাবনার সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নসহ কয়েকটি এলাকায় পদ্মা নদীতে দেখা দিয়েছে তীব্র নদীভাঙন। নদীগর্ভে বিলীনের মুখে পড়েছে উপজেলার নাজিরগঞ্জ ফেরিঘাট। কিন্তু ভাঙনরোধ ও ঘাট রক্ষায় দেখা যায়নি তেমন উদ্যোগ। দ্রæত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি সংশ্লিষ্টদের। কয়েকদিন ধরে এ ভাঙন অব্যাহত থাকলেও চলমান অতিবৃষ্টিতে উজানের পানির চাপ বাড়ায় বাড়ছে উদ্বেগ। তীব্র হচ্ছে ভাঙন পরিস্থিতি। এতে আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের।

নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, নদীভাঙন ঠেকাতে ও ঘাট রক্ষায় শুষ্ক মৌসুম বা বছরের অন্যান্য সময় নেওয়া হয় না তেমন উদ্যোগ। ফলে নিগৃহীতই রয়ে গেছে ফেরিঘাট। বছরজুড়েই পদ্মা নদীতে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করলেও সে বিষয়ে টুকটাক পদক্ষেপের বাইরে নেওয়া হয় না ব্যবস্থা। ফলে যখন তখন দেখা দেয় ভাঙন। এছাড়া পশ্চিম পাশে বড় বড় বøক দিয়ে নদীর তীর রক্ষা করা হলেও পূর্বপাশের তীর রক্ষায় নেওয়া হয়নি তেমন উদ্যোগ। ফলে কয়েক বছর ধরেই অব্যাহত রয়েছে ভাঙন। তবে এবারের ভাঙন বেশি হওয়ায় আতঙ্কিত ঘাট কর্তৃপক্ষ ও নদীপাড়ের বাসিন্দারা। তারা বলছেন, এ ভাঙন অব্যাহত থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নদীগর্ভে যাবে তাদের বসতভিটা। হারাতে হবে মাথা গোজার শেষ ঠাঁইটুকুও। তাই ভাঙনরোধে দ্রæত পদক্ষেপের দাবি তাদের। 

বিআইডব্লিউটিএর নাজিরগঞ্জ ঘাট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, এবার ভাঙন বেশি। এভাবে ভাঙতে থাকলে নদীগর্ভে ঘাট বিলীনের আশঙ্কা রয়েছে। সেরকম পরিস্থিতি হলে ঘাট এখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু এ অবস্থাতেও আমাদের তেমন কিছুই করার নেই। কারণ চিঠি দেওয়া বা বার বার যোগাযোগ করা হলেও স্থানীয় প্রশাসন গেজেট অনুযায়ী ঘাট ও এর আওতাধীন জমি আমাদের বুঝিয়ে দেয়নি। আপত্তি জানানো সত্তে¡ও উল্টো তারা ইজারা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, এর আগে এসিল্যান্ড ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সীমানা নির্ধারণে একটি কমিটি করা হয়। গেজেট অনুযায়ী সে সীমানা নির্ধারণ করে গত মে মাসে ইউএনওকে রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। কিন্তু দু’মাসেও সে রিপোর্ট ডিসি সাহেবের কাছে যায়নি। এভাবেই সবকিছু ঝুলে আছে। আমরা আমাদের ঘাট ও সংশ্লিষ্ট এলাকা দেখভাল করতে পারছি না। এদিকে এই যে ভাঙন শুরু হয়েছে সে ব্যাপারে তারা কোনো পদক্ষেপও নিচ্ছেন না।





আরও খবর


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : bhorerdakonline@gmail.com, adbhorerdak@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : bhorerdakonline@gmail.com, adbhorerdak@gmail.com